Showing posts with label Special Article. Show all posts
Showing posts with label Special Article. Show all posts

ছাহিবুল মি’রাজ, মাশুকে মাওলা, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র মি’রাজ শরীফ-বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে উপলব্ধির ব্যর্থ প্রয়াস সম্পর্কে কিছু কথা

October 21, 2018

Image result for পবিত্র মি’রাজ শরীফ-বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

পবিত্র কা’বা শরীফ

থেকে জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীর মুবারকে পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস শরীফ হয়ে নিমিষে মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তা’য়ালা পর্যন্ত গমন ও দীদার এবং সেখান থেকে নিমিষে পবিত্র কা’বা শরীফে নূরে মুজাসসাম, মাশুকে মাওলা, ছাহিবে মি’রাজ, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রত্যাবর্তনকে আমভাবে পবিত্র মি’রাজ শরীফ নাম মুবারকে অভিহিত করা হয়। পবিত্র মি’রাজ শরীফ দু’ভাগে বিভক্ত: ইসরা ও মি’রাজ। পবিত্র কা’বা শরীফ থেকে পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস শরীফ পর্যন্ত ইসরা এবং  পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস শরীফ থেকে মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তা’য়ালা পর্যন্ত যাওয়া ও পবিত্র দীদার উনাকে পবিত্র মি’রাজ শরীফ বলা হয়। এ মর্মে মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তা’য়ালা তিনি পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন: “মহান আল্লাহ পাক তিনি পরম পবিত্র ও মহিমাময়। তিনি আপন প্রিয়তম হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে রাতের অতি স্বল্প সময়ে পরিভ্রমণ করিয়েছেন পবিত্র মসজিদে হারাম শরীফ থেকে পবিত্র মসজিদে আকসা শরীফ পর্যন্ত। যার চারপাশে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি। যাতে আমি আমার প্রিয়তম হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে আমার কুদরত মুবারক উনার নিদর্শনসমূহ দেখিয়ে দিই। নিশ্চয়ই আমি শ্রবণকারী এবং দর্শনকারী।” সুবহানাল্লাহ!
পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার সামগ্রিক বিষয় আকরামুল আউওয়ালীন ওয়াল আখিরীন, মাশুকে মাওলা, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনন্য মু’জিযা শরীফ এবং মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরত মুবারক উনাদের পবিত্র সমন্বয়ে সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি মানুষের সহজাত সীমীত উপলব্ধি ও অনুভবের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল নয়। মূলত: পবিত্র মি’রাজ শরীফ মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তা’য়ালা এবং উনার প্রিয়তম হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের মহামিলন ও মু’য়ামিলার এমন এক আনুষ্ঠানিকতার বহিঃপ্রকাশ, যা হাক্বীক্বীভাবে কুল কায়িনাতের অভাবনীয় ও অবোধ্য।
প্রেক্ষিত কারণে পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার হাক্বীক্বী উপলব্ধির ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন কষ্ট-কল্পনা ও ধ্যান-ধারণার আশ্রয় নিয়ে থাকে। সেসবের মধ্যে সূতিকাগারে ঘুরপাক খাওয়া বিজ্ঞানকেই মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ অবলম্বন হিসেবে মনে করে থাকে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় যারা পবিত্র মি’রাজ শরীফ, পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ এবং সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উপলব্ধি করতে চায়, তারা অবোধ ও মূর্খ। অনুধাবণ ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সম্মানিত ইসলাম ও বিজ্ঞান যখন সাংঘর্ষিক হয়, নাদান ও গ- মূর্খরা তখন বিজ্ঞানকেই প্রাধান্য দিতে চায়। নাউযুবিল্লাহ! মুসলমান উনাদের মধ্যে যাদের ঈমান ও আক্বীদা বিশুদ্ধ নয়, তারাও ওই বাতিল পন্থীদেরই দলভুক্ত। নাউযূবিল্লাহ!  বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে পবিত্র মি’রাজ শরীফ, বিশেষ করে, পবিত্র দিদার বিরোধী অনেক বই-পুস্তক বেরিয়েছে। পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার বিরুদ্ধাচারণ করা, ভুল ব্যাখ্য দেয়া তথাকথিত বিজ্ঞান মনষ্ক একটি বোদ্ধা মহল এবং উলামায়ে ‘সূ’দের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাউযুবিল্লাহ!
বিস্তারিত এই লিঙ্কে  https://asaduzzaman347.blogspot.com
আইনষ্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব মিলিয়ে অনেকে পবিত্র মি’রাজ শরীফ সম্পর্কে আজগুবি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়ে থাকে। আইনষ্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বমতে আলোর গতির চেয়ে অধিক কোনো গতি নেই। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব হলো ১৫ কোটি কিলোমিটার। আর আলোর গতিবেগ হলো প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মর্মানুযায়ী সম্মানিত বোরাক এক সেকেন্ডের বহু পূর্বেই ১৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফেলেছেন। আলোর গতি অনুযায়ী চললে সূর্যের দূরত্ব পরিমাণ পথ অতিক্রমণে সম্মানিত বোরাক উনার প্রয়োজন হতো কমপক্ষে ৮ মিনিট, যা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সম্মানিত বোরাক উনার গতির সঙ্গে আলোর গতির তুলনা করতে যাওয়া গুমরাহী ছাড়া আর কিছু নয়। তাই পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় আইষ্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অচল।
পবিত্র মি’রাজ শরীফে ছাহিবুল ওহী ওয়াল কুরআন, রহমতুল্লিল আলামীন, রউফুর রহীম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা উনার সঙ্গে পবিত্র দিদার ও আলাপন এবং পবিত্র ওহী মুবারক লাভ শেষে যমীনে প্রত্যাবর্তনের পর দেখা যায়, যে বিছানা মুবারকে তিনি শায়িত থেকে পবিত্র মি’রাজ শরীফে গমন করেছিলেন, তা গরম রয়েছে, পবিত্র অযূ মুবারক উনার পানি গড়িয়ে যাওয়া শেষ হয়নি এবং দরজা মুবারক উনার শিকল নড়ছে। সুবহানাল্লাহ!
বিজ্ঞানের ফরমুলায় এক শ্রেণির নাদান পবিত্র মি’রাজ শরীফ বুঝতে চায়। মধ্যাকর্ষণ শক্তি অতিক্রমণের বিষয় সমাধান করতে চায়। নাউযূবিল্লাহ! তারা বলে এবং বিশ্বাস করে, পবিত্র মি’রাজ শরীফ অনুষ্ঠানকালে সময়কে আটকে রাখা হয়েছে। যে কারণে পবিত্র মি’রাজ শরীফ অনুষ্ঠানে দীর্ঘ ২৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও পবিত্র বিছানা মুবারক গরম থেকেছে। পবিত্র অযূর পানি মুবারক গড়িয়ে যেতে থেকেছে। দরজা মুবারকের শিকল মুবারক নড়তে থেকেছে। সময় আটকে রাখার কারণে দীর্ঘ ২৭ বছর পার হলেও মুবারক এ বিষয়গুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হতে পারেনি। নাউযূবিল্লাহ!
পবিত্র মি’রাজ শরীফ অনুষ্ঠানকালে সময়ের চলমানতা আটকে রাখার বিষয়টি বাতিলপন্থীদের উদ্ভাবন। আসলে সময়তো মহান আল্লাহ পাক তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন। উনার কায়িম মাক্বাম হিসেবে সময়তো স্বয়ং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিই সময়ের নিয়ন্ত্রক ও পরিচালক। দীর্ঘ ২৭ বছর এমনভাবে অতিক্রান্ত হয়েছে, যেখানে কুদরতীভাবে সময়ের গতিময়তার কোনো ক্ষেত্রই সৃষ্টি হতে পারেনি। যেমন মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা উনার কাছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত একাকার। অর্থাৎ সবই বর্তমান। অথচ সময়ের গতিময়তা কখনো থেমে নেই। নিগূঢ় এ বিষয়টি উপলব্ধির জন্য যে সমঝ ও যোগ্যতা প্রয়োজন, তা বিজ্ঞানমনস্ক নাদান ও জাহিলদের নেই।
পবিত্র মি’রাজ শরীফ অস্বীকার ও অবিশ্বাসকারী নাস্তিক, গুমরাহ ও কাফিররা পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার সত্যতা, পবিত্র দিদার এবং আনুষঙ্গিক মুবারক বিষয়গুলোতে অধুনা যে সব প্রশ্ন উত্থাপন করে, ১৪শ’ বছর আগে পবিত্র মক্কা শরীফের কাফির, মুশরিক, ইহুদী ও পৌত্তলিকরাও একই প্রকার প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, কূট তর্কে লিপ্ত থেকেছে। তাদেরই অধস্তন সন্তান হলো পবিত্র মি’রাজ শরীফ অবিশ্বাসকারী বর্তমানকালের তথাকথিত প্রগতিবাদী গোষ্ঠী। এদের কথা ও বোধ-বিশ্বাসের প্রেক্ষিতে বলতে হয়, আপন প্রিয়তম হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পবিত্র দিদারদানের লক্ষ্যে মুবারক সন্নিধানে নেয়ার জন্য মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা উনার ক্ষমতা ও কুদরত কোনটিই ছিলো না এবং বর্তমানেও নেই। নাউযুবিল্লাহ!
মধ্যাকর্ষণ শক্তির বাধা এবং মহাকাশের বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা ভেদ করে কিভাবে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র মি’রাজ শরীফ সম্পাদিত হলো এবং অক্সিজেন ছাড়া তিনি কিভাবে মহাকাশে বেঁচে রইলেন, তা নিয়ে বাতিলপন্থীরা অত্যন্ত চিন্তাযুক্ত। মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা উনার কুদরত মুবারক, উনার প্রিয়তম হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মু’জিযা শরীফ, পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের অকাট্য দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্বাস না করে বিজ্ঞানের ফরমুলায় মনগড়াভাবে উলামায়ে সূ’, গুমরাহ গোষ্ঠী ও বাতিলপন্থীরা পবিত্র মি’রাজ শরীফ, সিনা মুবারক চাক উনাদের হাক্বীক্বত বুঝতে চায়। নাউযুবিল্লাহ!
পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি আছে। সে শক্তি শূন্য মন্ডলের যে কোনো স্থূল বস্তুকে নিচের দিকে টেনে আনে। ফলে শারীরিকভাবে মহাকাশ ভ্রমণ সম্ভব নয় মর্মে কাফির মুশরিকরা যে যুক্তি প্রদর্শন করে, সে যুক্তি আজকের বিজ্ঞান প্রত্যাখ্যান করে। শূন্যে অবস্থিত যে কোনো স্থূল বস্তুকেই পৃথিবী একইভাবে আকর্ষণ করতে পারে না। পৃথিবীর কোনো বস্তু যখন “নিউট্রাল জোন”-এ পৌঁছে যায়, তখন সে বস্তুর পৃথিবীতে ফিরে আসার সম্ভাবনা তেমন থাকে না। বিজ্ঞান বলে, কোনো বস্তু যদি প্রতি সেকেন্ডে মোটামুটি সাড়ে ৭ মাইল বেগে উপরের দিকে ছুটে চলে, তবে সে বস্তু পৃথিবীতে আর ফিরে আসে না। পৃথিবী হতে কোনো বস্তু যতোই উর্ধ্বলোকে যেতে থাকে, ততোই তার ওজন কমতে থাকে। এজন্য উর্ধ্বপানে সে বস্তুর গতি ক্রমান্বয়ে সহজতর হতে থাকে। ঘন্টায় ২৫ হাজার মাইল এর বেশী গতিতে উর্ধ্বলোকে অগ্রসর হতে পারলে পৃথিবীর আকর্ষণ থেকে মুক্তিলাভ করা যায়। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছে “মুক্তি গতি”।
এসব কারণে আধুনিক বিজ্ঞান পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিতে চায়না। পবিত্র মি’রাজ শরীফ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আমরা এসব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার উপর আদৌ নির্ভর করিনা। জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয় উপলব্ধির জন্য সব সময় ‘বিজ্ঞান’-‘বিজ্ঞান’ বলে যারা চেঁচামেচি করে, তাদের মনোরঞ্জনের জন্যই আলোচ্য উদাহরণগুলোর অবতারণা।
জড় জগতের গ্রহ উপগ্রহগুলোইতো মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি। পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার হাক্বীক্বত বুঝবে কী করে? তাহতাচ্ছারা থেকে পবিত্র আরশ মুয়াল্লাহ পর্যন্ত আলমে খালক্ব। পবিত্র আরশ থেকে পবিত্র আলমে আমর শুরু। উভয় জগতই নূরে মুজাসসাম, মাশুকে মাওলা হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এক কাতরা নূর মুবারক দ্বারা সৃষ্টি। উভয় জগতেই উনার অবাধ বিচরণ। আরশ, কুরসী, লাওহ, কলম, জান্নাত, জাহান্নাম, এমনকি পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফসহ ইহকাল ও পরকালের সমুদয় বিষয় আকরামুল কারাম, রসূলুল মালিকিল আ’লাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সীমাহীন ইলম উনার সামান্য অংশ মাত্র। সুবহানাল্লাহ!
ছাহিবুল ওহী, ছাহিবুল কাওছার, ছাহিবুল ওয়াসীলাহ, মাশুকে মাওলা, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন: “মহান আল্লাহ পাক উনার সঙ্গে আমার এমন নিগূঢ় নৈকট্য, যেখানে কোনো নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম, কোনো ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম অথবা অন্য কারো স্থান সংকুলান হয় না।” সুবহানাল্লাহ! সৃষ্টিলগ্ন থেকেই তিনি দায়িমী ছোহবত ও পবিত্র দিদার মুবারকে মাশগুল রয়েছেন। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে যে, তিনি অনুক্ষণ মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহু ওয়া তায়ালা উনার কুদরত মুবারকের মধ্যে রয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!
সার্বক্ষণিক নিগূঢ় নৈকট্য, ছোহবত, দিদার ও আলাপন উনাদের মুবারক বিষয়টি মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র মি’রাজ শরীফে উনার আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে কুল কায়িনাতকে জানিয়ে দিলেন। জানিয়ে দিলেন পবিত্র মি’রাজ শরীফ, সিনা মুবারক চাক, দিদার, আলাপন কেবলই মাশুকে মাওলা, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য শোভনীয় ও সহনীয়। অন্য কারো জন্যই নয়। জানিয়ে দিলেন, তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার মা’শুক। তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার ক্বায়িম মাক্বাম। জানিয়ে দিলেন মহান আল্লাহ পাক উনার পরেই উনার প্রিয়তম হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক অধিষ্ঠান। সুবহানাল্লাহ!
আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা হয়েছে ১০০ বছর আগে। আর ইলম, হিকমত, প্রজ্ঞা, মুহব্বত-মারিফাত, তায়াল্লুক-নিসবত উনাদের সূচনা হয়েছে- আবূল বাশার মুহম্মদ ছফিউল্লাহ হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার মুবারক সময় থেকে। ছাহিবে শাফায়াতে কুবরা, ছাহিবে মাক্বামে মাহমুদ, ছাহিবে ঈমান, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র আঙ্গুল মুবারক উনার ইশারায় চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়া, উনার পবিত্র সিনা মুবারক চাক সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা কী আধুনিক বিজ্ঞান দিতে পারে? কস্মিনকালেও নয়। পবিত্র মি’রাজ শরীফ, পবিত্র সিনা মুবারক চাক-পবিত্র এ বিষয়গুলো নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, মাশুকে মাওলা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনন্য মু’জিযা শরীফ। এই মুজিযা শরীফ উনার কোনো ব্যাখ্যাই বিজ্ঞানে নেই।
পবিত্র মি’রাজ শরীফ শুধুই আনুষ্ঠানিকতা। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহানতম শান সমূহের একখানি মুবারক শান উনার বহি:প্রকাশ। পবিত্র দিদার, পবিত্র ছোহবত দুনিয়ার যমীনেও দান করা সম্ভব এবং তা সার্বক্ষণিকভাবে করাও হয়েছে। মূল বিষয়টি সমঝদার উনাদের জানা আবশ্যক। তা হলো, উহুদ ও তায়িফ-এর ঘটনার সঙ্গে পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার কোনোই পার্থক্য নেই। কারণ নুবুওওয়াত ও রিসালত, মান-শান, মর্যাদা-মাক্বাম উনাদের কখনোই কোনো রূপান্তর ঘটেনি। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, মাশুকে মাওলা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন: “আমি মহান আল্লাহ পাক উনার সঙ্গে রাত যাপন করি। মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে খাওয়ান এবং তিনি আমাকে পান করান।” সুবহানাল্লাহ!
মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তা’য়ালা তিনি পবিত্র কালাম পাক উনার মধ্য ইরশাদ মুবারক করেন যে, পবিত্র মি’রাজ শরীফ  সংঘটিত হয়েছে মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য। বিশুদ্ধ আক্বীদায় মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরত মুবারক, মহান আল্লাহ পাক উনার সঙ্গে নূরে মুজাসসাম, মাশুকে মাওলা, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিগূঢ় সম্পর্ক এবং উনার সীমাহীন শান-মান, মর্যাদা-মাক্বাম সম্পর্কে বিশুদ্ধ আক্বীদায় কে বিশ্বাস করে, আর কে বিশ্বাস করেনা, তা যাচাই করার জন্য। পবিত্র মি’রাজ শরীফ যারা অস্বীকার ও অবিশ্বাস করে, তারা নামায অস্বীকার করে। নাউযূবিল্লাহ! কাজেই তারা কাফির। পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার মূল তোহফাইতো পবিত্র নামায। সুবহানাল্লাহ!
মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তা’য়ালা উনার কুদরত মুবারক এবং হযরত নবী রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের, বিশেষ করে ছাহিবু লিওয়ায়িল হামদ, ছাহিবু কা’বা কাউসাইন, ছাহিবুল মি’রাজ, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র মু’জিযা শরীফ উনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিজ্ঞানের সাধ্যাতীত। বিজ্ঞান শুধু এতোটুকু বলতে পারে যে, “বিষয়টি শুধুই মহান আল্লাহ পাক উনার ক্ষমতা ও ইখতিয়ারভুক্ত।” ফিরাউনের মোতায়েনকৃত যাদুকরদের মুকাবিলায় হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র লাঠি মুবারক উনার সাপে পরিণত হওয়া, যাদুকরদের সকল সাপ গিলে ফেলা, রশিতে রূপান্তর হওয়া এবং লাঠি মুবারকে আলো জ্বলে উঠার মু’জিযা শরীফ উনার কোনো ব্যাখ্যাই বিজ্ঞানে নেই।
ছাহিবে লাওলাক, নূরে মুজাসসাম, ছাহিবু কা’বা কাউসাইনী আও আদনা, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান-মান, মর্যাদা-মাক্বাম, ফাযায়িল-ফযীলত সীমাহীন। আবাদুল আবাদ পর্যন্ত কুলকায়িনাতের দায়িমী ছানা-ছিফত কস্মিনকালেও উনার সীমাহীন মর্যাদা ও মাক্বাম, ফাযায়িল-ফযীলত উনাদের সমান্তরাল হবে না, অর্থাৎ সমান হবে না। তাই মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তা’য়ালা তিনি এ অসনীয় শূন্যতা পূরণের জন্য সর্বক্ষণ উনার মাশুক, উনার প্রিয়তম হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র ছালাত পাঠে, অর্থাৎ উনার পবিত্র ছানা-ছিফত মুবারকে মশগুল রয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!
পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার হাক্বীক্বী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিজ্ঞানে নেই। এটিই হলো আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনার ছহীহ আক্বীদা। যারা এই আক্বীদায় বিশ্বাসী নয়, অর্থাৎ যারা বিজ্ঞান মনষ্ক বোধ-বিশ্বাসে পবিত্র মি’রাজ শরীফ অবিশ্বাস ও অস্বীকার করে, তারা কাট্টা কাফির। পবিত্র মি’রাজ শরীফ উপলব্ধির জন্য অনিবার্য সমঝ, মন, মনন, ছহীহ আক্বীদার উৎসমূল হলেন পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা ও ক্বিয়াস শরীফ। কখনোই বিজ্ঞান নয়। আর এসব নিয়ামত হাছিলের উন্মেষ ঘটে পঞ্চদশ হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ, মুজাদ্দিদে মাদারজাদ, সাইয়্যিদে মুজাদ্দিদে আ’যম, আওলাদে রসূল, ক্বায়িম মাক্বামে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাইয়্যিদুনা মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা  কা’বা আলাইহিস সালাম, রাজারবাগ শরীফ, ঢাকা- উনার মুবারক সান্নিধ্যে। সুবহানাল্লাহ!
http://stratoplot.com/1WFg

সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গওছুল আ’যম, মুজাদ্দিদুয যামান, সুলত্বানুল আরিফীন, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি

October 21, 2018


Image result for হযরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী জিবনী


সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গওছুল আ’যম, মুজাদ্দিদুয যামান, সুলত্বানুল আরিফীন, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি (১)


মহান আল্লাহ পাক তিনি এক লক্ষ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। শুধু রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সংখ্যাই হচ্ছে তিনশত তেরজন। অপর বর্ণনায় রয়েছে তিনশত পনের জন।
উনারা সবাই জিন-ইনসানকে আল্লাহ পাক উনার দিকে আহ্বান করেছেন, মা’রিফাত-মুহব্বত হাছিলের শিক্ষা দিয়েছেন। তাদেরকে করেছেন ইছলাহ বা পরিশুদ্ধ। উনাদের এই কাজে খিদমতের জন্য আল্লাহ পাক কতিপয় ব্যক্তিত্বকে মনোনিত করেছেন, যাদেরকে আমরা আওলিয়ায়ে কিরাম হিসেবে জেনে থাকি। মূলত: এই এক লক্ষ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত আগত অসংখ্য-অগণিত আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা প্রত্যেকেই জিন-ইনসানের প্রতি আল্লাহ পাক উনার বিশেষ এক নিয়ামত, দয়া, দান, ইহসানেরই বহিঃপ্রকাশ। কালাম পাক-এর এই আয়াত শরীফখানা সেক্ষেত্রে সেদিকে দালালত করেছে-
لقد من الله على المؤمنين اذ بعث فيهم رسولا من انفسهم يتلوا عليهم اياته ويزكيهم ويعلمهم الكتاب والحكمة وان كانوا من قبل لفى ضلل مبين.
অর্থ: আল্লাহ পাক মু’মিনগণের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তাদের মাঝে একজন রসূল পাঠিয়েছেন। যিনি তাদেরকে উনার আয়াত শরীফসমূহ তিলাওয়াত করে শুনান। তাদেরকে ইছলাহ (পরিশুদ্ধ) করেন, কিতাব শিক্ষা দেন, হিকমত শিক্ষা দেন। যদিও তারা পূর্বে সুষ্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল। (সূরা আলে ইমরান-১৬৪)
উল্লেখ্য যে, হযরত আওলিয়ায়ে কিরামগণ উনারা হচ্ছেন হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের নায়িব বা প্রতিনিধি, স্থলাভিষিক্ত। আর আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনি হচ্ছেন সর্বশেষ নবী ও রসূল। উনার পরে আর কোন নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম আসবেন না। নুবুওওয়াত ও রিসালতের ধারা বন্ধ হয়েছে।
তবে যাঁরা উনার প্রতিনিধিত্ব করবেন, নায়িব হবেন উনাদের আগমনের ধারা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ইমাম, মুজতাহিদ, মুজাদ্দিদ, ফক্বীহ, ছূফী, গওছ, কুতুব, ওলী, আবদাল, নাকিব, নুযাবা ইত্যাদি সবাই হচ্ছেন আখিরী রসুল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নায়িব বা প্রতিনিধি, স্থলাভিষিক্ত।
সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, মুজাদ্দিদে যামান, সুলত্বানুল আরিফীন, গওছুল আ’যম, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হচ্ছেন উনাদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন সেই যামানার মুজাদ্দিদ, ইমাম, গওছ, দ্বীন জিন্দাকারী, উম্মাহ’র জন্য রহমত স্বরূপ। পূর্ববর্তী অনেক আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণই উনার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। উনার শান-মান, মর্যাদা-মর্তবার আলোচনা করেছেন।

পূর্ববর্তী আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ভবিষ্যদ্বাণী

আল্লাহ পাক উনার এমন অনেক ওলী রয়েছেন যাঁদের মর্যাদা-মর্তবার বিষয়টি সম্পর্কে আওলিয়ায়ে কিরামগণ উনারা পূর্বেই অবহিত হয়েছেন। প্রচার ও প্রকাশ করেছেন। সেই সমস্ত মহান ব্যক্তিত্বের অন্যতমত হচ্ছেন সাইয়্যিদুল আওলিয়া মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, আওলাদে রসূল, শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি।
উনি দুনিয়াতে তাশরীফ আনার অনেক পূর্ব থেকে ইমাম-মুজতাহিদ ও আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা সবাই নিজ নিজ যুগে ও নিজ মুরীদ, মু’তাকিদ মুহিব্বীন, আশিকীনদের মাঝে উনার শান-মান-মর্যাদা মর্তবার আলোচনা করেছেন। উনার পরিচয় বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা এই সুসংবাদ কখনো স্বপ্নে, কাশফে, মোরাকাবায় বিভিন্নভাবে অবগত হতেন এবং প্রচার প্রসার করতে আদিষ্ট হয়েছেন। (চলবে)

হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন।

https://asaduzzaman347.blogspot.com



সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গওছুল আ’যম, মুজাদ্দিদুয যামান, সুলত্বানুল আরিফীন, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি (২)


হযরত ইমাম আবুল হাসান শাত্বনুনী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিশ্বখ্যাত কিতাব æবাহজাতুল আসরার”-এর ৬ষ্ঠ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, হযরত শায়েখ আবু বকর ইবনে হাওয়ার রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নিজের মুরীদ, মু’তাকিদীন, মুহিব্বীনগণের মাঝে হযরত আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের জীবনী মুবারক আলোচনা করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ইরাকে একজন আজমী (অনারবী) ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটবে। তিনি সমস্ত লোকের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন হবেন। উনার মুবারক নাম হবে হযরত আব্দুল কাদির রহমতুল্লাহি আলাইহি। উনি বাগদাদ শরীফ-এ অবস্থান করবেন। তিনি বলবেন, æআমার এই ক্বদম মুবারক ওলীআল্লাহগণ উনাদের গর্দানের উপর। উনার যামানার সকল ওলীআল্লাহগণই উনার সেই কথা মুবারক মেনে নিবেন। তিনি হবেন একক মর্যাদা-মর্তবা সম্পন্ন মহান ব্যক্তিত্ব।
হযরত শায়েখ আবু আহমদ আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ ইবনে মুসা রহমতুল্লাহি আলাইহি র্যাদ পাহাড়ে নির্জনতা অবলম্বন করা কালীন সময়ে একদিন হঠাৎ বলে উঠলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আজমী ভূমিতে (ইরান) একজন সন্তান তাশরীফ আনবেন, উনার অসংখ্য-অগণিত কারামত প্রকাশিত হবে। আর সমস্ত আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের উপর উনার শ্রেষ্ঠত্ব হবে।
তিনি বলবেন, আমার এই ক্বদম মুবারক সমস্ত আওলিয়ায়ে কিরাম উনাদের গর্দানের উপর। একথা শুনে সেই সময় আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনাদের নিজ নিজ গর্দান মুবারক ঝুঁকিয়ে দিবেন। উনার কারণে সে যামানার সমস্ত লোকই সম্মানিত ও মর্যাদাবান হবেন। যে ব্যক্তি উনাকে দেখবে, ছোহবত লাভ করবে সে অফুরন্ত ফায়দা হাছিল করবে। সুবহানাল্লাহ! (বাহজাতুল আসরার-৭)
গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মুজাদ্দিদে যামান, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যুবক বয়সে তাজুল আরিফীন হযরত আবুল ওয়ালিফা কাকীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জিয়ারতের (সাক্ষাৎ) জন্য বাগদাদ শরীফ-এ আসা-যাওয়া করতেন। যখনই হযরত আবুল ওয়ালিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনাকে দেখতেন তখনই উনার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যেতেন। আর উপস্থিত মুরীদ-মু’তাকিদগণকে বলতেন যে, তোমরা ওলীআল্লাহ উনার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাও। অধিকাংশ সময়ই তিনি একথা বলতেন, এই যুবক তথা গাউছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আওলিয়া, হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্মানার্থে যদি কেউ না দাঁড়ায় তাহলে সে কার সম্মানার্থে দাঁড়াবে? অর্থাৎ তিনি সম্মান-ইজ্জত পাওয়ার সর্বাধিক হক্বদার।
লোকেরা অসংখ্যবার উনার থেকে এরূপ কথা শুনতে পেয়েছেন। যার কারণে মুরীদ-মু’তাকিদগণ একদিন এর হিকমত বা রহস্য জানতে চাইলেন যে, কে এই যুবক, যাঁর সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে আপনি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন, তাগিদ দিয়ে থাকেন? তখন তিনি বললেন, ওই যুবকের উপর এমন একটি সময় আসবে, যখন আম (সাধারণ) খাছ (বিশিষ্ট) সবাই উনার ছোহবতের মোহতাজ (মুখাপেক্ষী) থাকবে। তিনি যা বলবেন, তা সত্যে পরিণত হবে। তিনি বলবেন, ওলীআল্লাহগণ উনাদের গর্দানের উপর আমার ক্বদম মুবারক। একথা শুনে সমস্ত ওলীআল্লাহ উনারা নিজেদের গর্দান উনার সম্মানার্থে ঝুঁকিয়ে দিবেন। কারণ, তিনিই হবেন সেই যুগের কুতুব। কাজেই, তোমাদের মধ্যে যদি কেউ সেই সময় পায় তাহলে তার আবশ্যক হবে উনার খিদমত করা। (বাহজাতুল আসরার-৮)
আল্লামা হযরত শায়েখ আক্বীল মুনজিরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খিদমতে আরয করা হলো যে, এখন কুতুবুল আলম কে? তিনি জাওয়াবে বললেন, বর্তমান যামানার যিনি কুতুব, তিনি এখন মক্কা শরীফ-এ অবস্থান করছেন। তিনি এখনো প্রকাশিত হননি। ওলীআল্লাহগণ উনারা ব্যতীত অন্য কেউ বিষয়টি জানে না। জেনে রেখো, অতিশীঘ্রই একজন যুবকের প্রকাশ ঘটবে। একথা বলে তিনি ইরানের দিকে ইশারা করলেন। সেই যুবক হবেন আজমী বা অনারবী। তিনি বাগদাদ শরীফ-এ লোকদেরকে ওয়াজ-নছীহত করবেন। উনার কারামত আম-খাছ সবার কাছেই পৌঁছবে। সবাই উনার কারামতের স্বীকৃতি দিবেন। তিনি হবেন উনার যামানার কুতুব। তিনি বলবেন, আমার ক্বদম মুবারক সমস্ত ওলীআল্লাহ উনাদের স্কন্ধের উপর। আর আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ আপন আপন কাঁধ মুবারক উনার খিদমতে ঝুঁকিয়ে দিবেন। সবাই উনার আনুগত্য হবেন। আমি যদি সে যামানা পেতাম আমিও উনার খিদমতের জন্য আমার গর্দান বাড়িয়ে দিতাম। যে ব্যক্তি উনার কারামত, বুযুর্গীকে সত্য বলে মেনে নিবে সে অশেষ কল্যাণের অধিকারী হবে। (বাহজাতুল আসরার-৯)


সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গওছুল আ’যম, মুজাদ্দিদুয যামান, ইমামুর রাসিখীন, সুলত্বানুল আরিফীন, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি (১৪)



শিক্ষকতা:
শায়খুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ হযরত আবু সাঈদ মুবারক মাখযূমী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাদরাসায়ে নিযামিয়া-এর অন্যতম সুযোগ্য মুয়াল্লিম বা অধ্যাপক ছিলেন। সাইয়্যিদুল আওলিয়া, ইমামে রব্বানী, মাহবূবে সুবহানী, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ছাত্র অবস্থায় উনার সেই মাদরাসায়ে নিযামিয়া উনার শিক্ষার্থী হিসেবে যোগদান করলেন। তিনি উনাকে অত্যন্ত স্নেহ ও যত্ন করতেন এবং উনার তা’লীম-তরবিয়ত বা শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি বিশেষ নজর রাখতেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন বাগদাদ শরীফ-উনার একজন শ্রেষ্ঠ আলিম, খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ এবং অত্যন্ত কামিল বুযূর্গ। পরবর্তীতে তিনি নিজে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে নিজেই তাতে শিক্ষা দান করতেন।
ছাত্র অবস্থায় সাইয়্যিদুল আওলিয়া, ইমামে রব্বানী, মাহবূবে সুবহানী, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার তীক্ষè ধীশক্তি, অপরিসীম যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, কর্তব্যপরায়ণতা, দৃঢ়তা এবং অদম্য আগ্রহ-উদ্দীপনার পরিচয় পেয়ে তিনি নিজের এই সুযোগ্য ছাত্রটির প্রতি অত্যন্ত সুধারণা এবং উচ্চাকাঙ্খা পোষণ করে আসছিলেন যে, তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অত্যন্ত নৈকট্যপ্রাপ্ত হবেন। উনারই মাধ্যমে ইলম উনার সিলসিলা ক্বিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। এবার সেই ছাত্রই যখন বাগদাদ শরীফ উনার বাহির থেকে অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে ফিরে আসলেন, তখন তিনি উনার হাতে স্বীয় মাদরাসার শিক্ষকতা ও পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্বভার আগ্রহের সাথে তুলে দিলেন। সাইয়্যিদুল আওলিয়া, ইমামে রব্বানী, মাহবূবে সুবহানী, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিও এ জাতীয় একটি কাজের জন্য অতীব আগ্রহান্বিত ছিলেন। কারণ শিক্ষকতা বা শিক্ষাদান, যেটা আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খাছ সুন্নত। উপরন্তু তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন-
ان الله وملئكته واهل السماوات والارض حتى نملة فى حجرها حتى حوت فى جوفها يصلون على معلم الناس الخير.
অর্থ : “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি এবং উনার ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা, আসমানবাসী, যমীনবাসী এমনকি গর্তের পিপীলিকা এবং সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত সবাই শিক্ষাদানকারীর প্রতি ছলাত-সালাম পাঠ করেন।”
অতএব, তিনি তৎকালীন মৃতপ্রায় দ্বীন ইসলাম উনার কিছু খিদমত করার সুযোগ পেয়ে খুবই খুশি হলেন। এ মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমেই উনার কর্মময় মুবারক জীবন শুরু হলো।
উস্তাদ প্রদত্ত মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত হয়ে তিনি গভীর মনোযোগ ও অত্যন্ত দক্ষতার সাথেই উনার শিক্ষকতা এবং পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। তৎকালীন সময়ে উনার ইলিম-হিকমত, তাক্বওয়া-পরহেযগারিতা এবং কর্মদক্ষতার সাথে তুলনা করার মতো আর কেউ ছিল না। তাই একাধারে যেমন মাদরাসার শিক্ষার্থীবৃন্দ উনার মতো অতুলনীয় শিক্ষক লাভ করে ধন্য হয়েছিল। তেমনি বাগদাদবাসীগণ দীর্ঘদিন পরে তাদের প্রাণের লোক উনাকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়লেন।
সাইয়্যিদুল আওলিয়া, ইমামে রব্বানী, মাহবূবে সুবহানী, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জ্ঞান লাভ কেবল মাদরাসায় অধ্যয়নের ভিতরই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং উনার ইলিম ও পবিত্র হিকমত বিকশিত হয়েছিল আলোক রশ্মির মূল উৎস স্থল থেকে। যেখানে সকল জ্ঞান ও সত্যের উৎস মুখ, সেখান থেকেই উনার হৃদয়ে ইলিম ও হিকমতের অমিয়ধারা প্রবাহিত হয়েছিল। মহান আল্লাহ পাক এবং উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের থেকে তিনি খাছভাবে তা’লীম-তরবিয়ত পেয়েছেন তথা ইলমে লাদুন্নী পেয়েছেন। ফলে উনার শিক্ষাদান পদ্ধতি যে ছাত্র মহলে কত ব্যাপক ও গভীরভাবে সাড়া জাগিয়েছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি প্রাচীন শিক্ষানীতিকে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে তা এক নতুন ছাঁচে ঢেলে সাজিয়েছিলেন। মাত্র অল্প কিছুদিনের মধ্যেই উনার সুনাম-স্খ্যুাতি বিভিন্ন দেশে স্রোতধারার ন্যায় ছড়িয়ে পড়লো। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানান্বেষী, শিক্ষার্থীগণ এবং আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত-মা’রিফাত তালাশীগণ দলে দলে উনার মাদরাসায়, উনার ছোহবতে এসে হাজির হলেন। সকলে উনার নিকট বাইয়াত হয়ে উনার নিকট পবিত্র ইলিম ও হিকমত তালাশ করাকে পরম গৌরবের বিষয় বলে মনে করছিল।
ছাত্রজীবনে সাইয়্যিদুল আওলিয়া, ইমামে রব্বানী, মাহবূবে সুবহানী, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যে তেরটি বিষয়ে গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন, সেই তেরটি বিষয়েরই তিনি অধ্যাপনা করতেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র তাফসীর শরীফ, ফিক্বাহ, উছূল, সাহিত্য, ক্বাওয়ায়িদ বা ব্যাকরণ এবং মুয়ামিলাত-মুয়াশিরাত বা লেনদেন, জীবন-যাপন পদ্ধতি শিক্ষাদান করতেন। আবার যোহরের পর থেকে ইশা পর্যন্ত তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার অনুবাদ, তাওহীদ (একত্ববাদ), বিভিন্ন মাসয়ালা-মাসায়িল এবং অন্যান্য জরুরী বিষয়সমূহ শিক্ষা দিতেন। এমনিভাবে তিনি শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে তা’লীম-তরবিয়ত দানের মাধ্যমে আদর্শ মানুষ, আদর্শ আলিম হিসেবে গড়ে তুলতে লাগলেন।

সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গওছুল আ’যম, মুজাদ্দিদুয যামান, ইমামুর রাসিখীন, সুলত্বানুল আরিফীন, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি (২০)


সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুরিদানগণের মর্যাদা
শায়খ আবু মুহম্মদ আব্দুল লতিফ বিন শায়েখ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন- আমার আব্বাজান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেছেন- শায়েখ হাম্মাদ দাব্বাস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে প্রতি রাত্রে মধু মক্ষিকার শব্দের মত এক প্রকার গুঞ্জন শুনা যেত। সায়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সেই সময় উনার কাছে মুবারক ছোহবতে আসা-যাওয়া করতেন। লোকেরা উনার কাছে আরয করলেন, তিনি যেন শায়েখ হামাদ দাব্বাস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে সেই শব্দ মুবারক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি সে সম্পর্কে হযরত হাম্মাদ দাব্বাস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বলেন- আমার বার হাজার মুরিদ আছে। আমি খুবই দ্রুততার সাথে তাদের নাম ধরে ডাকি এবং তাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু আছে কিনা জিজ্ঞেস করি, যেন আমি মহান আল্লাহ পাক উনার কাছ থেকে মনজুর করায়ে নিতে পারি। আমার কোন মুরিদ ততক্ষণ মৃত্যুবরন করে না, যতক্ষণ তার তওবা কবুল না হয় বা এক মাসের মধ্যে উনার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয় না। এভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত এসব মুরিদদের উপর পড়ে থাকে, যারা শায়েখ হামাদ দাব্বাসর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হাতে বাইয়াত হন। এ কথা শুনে গাউসুল আ’যম সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি শায়েখ হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বললেন- যদি মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে এ মরতবা দান করেন, তাহলে আমি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে এ প্রতিশ্রুতি নিয়ে নেব, যেন কিয়ামত পর্যন্ত আমার কোন মুরিদ ততক্ষণ ইন্তেকাল না করে যতক্ষণ তার তওবা কবুল করা না হবে । আমি এ প্রতিশ্রুতির জিম্মাদার হবো।
শায়খ আবুল কাসেম ওমর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন- সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- যদি কোন ব্যক্তি আপনাকে মুহব্বতের সাথে স্মরণ করে, কিন্তু আপনার মুরিদ হওয়ার সৌভাগ্য না হয় কিংবা আপনার থেকে খিলাফতের খেরকা (জামা) না পায়, সে কি আপনার সহানুভূতি তথা ফায়েজ-তাওয়াজ্জুহ লাভকারী লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে? তিনি বলেন- যে ব্যক্তি কেবল নাম মুবারক উনার সাথে সম্পর্ক রাখবে বা অন্তরে আমার প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করবে, মহান আল্লাহ তায়ালা তার তওবা কবুল করবেন, যদিওবা সে আমার থেকে অনেক দূরে থাকে। মহান আল্লাহ পাক উনার কসম, মহান আল্লাহ পাক তিনি আমার সাথে ওয়াদা করেছেন যে, তিনি আমার মুরীদ-মু’তাকিদ, মুহ্বিীন, আশিকীন, আমার নাম জপকারী ও আমার প্রতি ভাল ধারণা পোষণকারীদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তিনি আরও বলেছেন- যদি আমার নাম মুবারক স্মরণকারী কারো দোষত্রুটি বা গুনাহ পশ্চিমপ্রান্তে প্রকাশ পায় এবং আমি পূর্ব প্রান্তে থাকি, তখনও আমি তার হিফাজতের জিম্মাদার হবো এবং তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবো। আমাকে এক চোখের পলক এক দীর্ঘ আমল নামা দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে আমার মুরিদগণের নাম লিখা আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত আগমণকারী মুহ্বতকারীদের নাম উল্লেখ আছে। আমাকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে এসব লোকদেরকে আমার খাতিরে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। আমি হাযরত মালিক ফেরেশতা আলাইহিস সালাম উনাকে (দোযখের দাররক্ষী) জিজ্ঞেস করেছি, আপনার কাছে আমার মুরীদ-মু’তাকিদ, মুহিব্বীনদের কেউ আছে কি? তিনি বললেন না। মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! আমার হাত আমার মুরিদগণের উপর ঐ রকম প্রসারিত, যেভাবে যমীনের উপর আসমানের ছায়া। সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহ পাক উনার জালালিয়াত ও ইজ্জতের কসম, আমি ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ করবো না, যতক্ষণ আমি আমার সমস্ত মুরিদগণকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে না পারবো। (যুবদাতুল আছার, গাউসুল অরা-৭৫)

সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গওছুল আ’যম, মুজাদ্দিদুয যামান, ইমামুর রাসিখীন, সুলত্বানুল আরিফীন, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি (২১)


কারামত বা অলৌকিক ঘটনা
كرامة (কারামত) শব্দের অর্থ: সম্মান, মর্যাদা, মহত্ত্ব, অলৌকিক ঘটনা। সাধারণ স্বভাবের বিপরীত যে সকল ঘটনা হযরত আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের দ্বারা প্রকাশিত হয় তাকেই কারামত বা অলৌকিক ঘটনা বলে। কারামত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট আওলিয়ায়ে কিরাম উনার মর্যাদা, মর্তবার বহিঃপ্রকাশ। কাফির, মুশরিক, ফাসিক-ফুজ্জারদের দ্বারাও স্বভাববিরোধী বা অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেতে পারে। আবার অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের দ্বারাও এরূপ ঘটনা প্রকাশ পেতে পারে। তবে তাকে কারামত বলা যাবে না। তাকে বলা হয়, ইস্তিদরাজ বা ভেল্কিবাজি। আর অপ্রাপ্তদের দ্বারা প্রকাশিত অলৌকিক ঘটনাকে আওন বলা হয়।
হযরত আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের কারামত সত্য। এর প্রতি বিশ্বাস করা ফরয। আক্বাঈদের কিতাবে বর্ণিত আছে-
كرامات الاولياء حق
অর্থ : “হযরত আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের কারামত সত্য।” (শরহে আক্বাঈদে নাসাফী) তার সততাকে বিশ্বাস করা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনার অন্যতম আক্বাঈদ বা বিশ্বাস। বাতিল ফিরক্বা মুতাযিলা; তারা কারামত বিশ্বাস করেনা। তাদের মতাদর্শের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে জামাতী, ওহাবী, খারিজী, লা-মাযহাবীরাও। তারাও কারামতকে অস্বীকার করে। যা তাদের গোমরাহী বা পথ ভ্রষ্টতারই প্রমাণ।
কারামতকে আমভাবে অস্বীকার করা কুফরী। আর ব্যক্তি বিশেষ কারামতকে অস্বীকার করা কুফরী না হলেও গোমরাহী থেকে খালি নয়। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষ কুফরীও হতে পারে।
কারামতকে অস্বীকার করা সংশ্লিষ্ট আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনার প্রতি বিদ্বেষভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। আর আওলিয়ায়ে কিরাম উনাদের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন হওয়া হালাকী বা ধ্বংসের কারণ। পবিত্র হাদীছে কুদসী শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
من عاد لى وليا فقد اذنته بالحرب
অর্থ : “মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আমার ওলী উনার সাথে বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়, তার সাথে আমি যুদ্ধের অনুমতি দেই তথা যুদ্ধ ঘোষণা করি।” (বুখারী শরীফ)
কেননা সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, গাউছুল আ’যম হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কারামতকে অস্বীকার করার কারণে কত লোক যে গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট হয়েছে তার বর্ণনা দিলে স্বতন্ত্র একটি গ্রন্থ রচিত হবে। সঙ্গতকারণে এখানে তার বর্ণনা দেয়া যাচ্ছে না।
ওলীআল্লাহ হওয়ার জন্য কারামত প্রকাশ পাওয়া শর্ত নয়। তবে প্রত্যেক ওলীআল্লাহ উনার কিছু না কিছু কারামত প্রকাশিত হয়ই। সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবুবে সুবহানী হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অসংখ্য- অগণিত কারামত মুবারক প্রকাশিত হয়েছে। আমরা সংক্ষিপ্তাকারে উনার কিছু কারামত প্রকাশ করবো। ইনশাআল্লাহ।
দার্শনিকের জ্ঞান বিলুপ্তিকরণ
হযরত শায়েখ আবুল মুজাফফর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, আমি একদিন সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মজলিসে হাজির হলাম। আমার হাতে গ্রীক দর্শন ও আত্মা বিষয়ক একটি বই ছিল। মজলিসে উপস্থিত এক ব্যক্তি আমাকে বললো, গাউছে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এ বই সম্পর্কে আপনাকে কিছু বললে আপনি কি বলবেন? কাজেই, সেটা ঘরে রেখে আসেন। তখন আমি সেটা ঘরের এক কিনারে রেখে আসার মনস্থ করলাম, যাতে শায়েখ অসন্তুষ্ট না হন। কিন্তু আমি দর্শন শাস্ত্রের প্রতি এতোই আকৃষ্ট ছিলাম যে, বইটি হাতছাড়া করতে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। বইটির অনেক বিষয় আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। তবুও গাউছে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্মানার্থে আমি যে মাত্র বইটি রেখে আসতে উঠতে গেলাম, আমি উঠতে পারলাম না। আমার অবস্থা এমন হয়ে গেল যেন আমি হাত-পা আবদ্ধ একজন কয়েদী। তিনি আমাকে বললেন, তোমার বইটি আমাকে দাও। উনাকে হস্তান্তর করার আগে একটু খুলে দেখি, সব কাগজ সাদা হয়ে গেছে। সব বর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যাক, আমি বইটি উনাকে দিয়ে দিলাম। তিনি এক এক পৃষ্ঠা উল্টায়ে দেখলেন এবং বললেন- এটাতো মুহম্মদ বিন জরিস লিখিত ‘ফাজায়েলে কুরআন’। আমি আশ্চর্য হয়ে বইটি হাতে নিয়ে দেখলাম, ঠিকই বইটি কুরআনের ফযীলতের উপর খুবই সুন্দরভাবে লিখিত। ইতোপূর্বে আমি দর্শন শাস্ত্রের যে সব বিষয় জ্ঞাত ছিলাম, সব ভুলে গেলাম এবং এমনভাবে ভুলে গেলাম যে আজ পর্যন্ত একটি বিষয়ও আমার স্মৃতিতে আসেনি। সুবহানাল্লাহ!

সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গওছুল আ’যম, মুজাদ্দিদুয যামান, ইমামুর রাসিখীন, সুলত্বানুল আরিফীন, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি (২৩)


বিছাল শরীফ

وصال (বিছাল) অর্থ মিলিত হওয়াসাক্ষাত করা। হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা মারা যাননা। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত আছে-
اناولياءاللهلايموتونبلينتقلونمندارالفناءالىدارالبقاء
অর্থ: নিশ্চয়ই আউলিয়ায়ে কিরাম উনারা মৃত্যুবরণ করেননা। বরং উনারা অস্থায়ী আবাস থেকে স্থায়ী আবাসের দিকে ফিরে যান। মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার হাবীবনূরে মুজাসসামহাবীবুল্লাহ উনাদের সাথে দায়িমী ও হাক্বীক্বী সাক্ষাত মুবারকে মিলিত হন। এজন্য উনাদের ইন্তিকালকে বিছাল শরীফ বা মুবারক বলা হয়। আর হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম উনাদের তাযীম বা সম্মানার্থে শরীফ কিংবা মুবারক শব্দটি সংযুক্ত করা হয়। যেহেতু নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন ইরশাদ মুবারক করেনমুসলমানরা যতক্ষণ পর্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি বা বিষয়ের যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা বিজয় বেশে কামিয়াবী লাভ করবে। আর যখন সম্মান ইজ্জত প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকবে তখন হালাক বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে
মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
كلنفسذائقةالـموتثماليناترجعون
অর্থ : প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। অতঃপর আমার কাছে ফিরে আসবে। (পবিত্র সূরা আনকাবুত: পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৭)
আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যেএই প্রত্যাবর্তন সকলের জন্য সমান নয়। হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার বন্ধু। উনাদের বিদায় বা বিছাল শরীফ বিশ্ববাসীর জন্য ইবরত-নছীহতপূর্ণ। যা বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়েতের কারণ। গাউছুল আযমসাইয়্যিদুল আওলিয়া হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পবিত্র জীবনী মুবারকে তার যথার্থ প্রতিফলন ঘটেছে। উনার বিলাদত শরীফের দিনটি যেমন বিশ্ববাসীর হিদায়েত তথা সঠিক পথের দিক নির্দেশক ছিল। তেমনি বিছাল শরীফ উনার দিনটিও ছিল বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়েতের কারণ
যখন হযরত গাউসুল আযম শায়েখ সাইয়্যিদ মুহীউদ্দিন আবদুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিছাল শরীফ উনার সময় নিকটবর্তী হয়ে গেল তখন উনার ইস্তিঞ্জা মুবারক উনার রাস্তা দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল। শুধু তাই নয়ইস্তিঞ্জা থেকে আতর গোলাপের ঘ্রাণ বের হচ্ছিল এবং তার মধ্য থেকে যিকিরও হচ্ছিল (সুবহানাল্লাহ)। ওনার মুরীদ মুতাক্বিদ যাঁরা ছিলেন উনারা বললেনহুযূর! আপনার শরীর অসুস্থ আপনাকে চিকিৎসা করানো দরকার। হযরত গাউসুল আযম শায়েখ সাইয়্যিদ মুহীউদ্দিন আবদুল কাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রথমে বললেনদেখ চিকিৎসা করে কি হবেযিনি সমস্ত চিকিৎসকের চিকিৎসকসমস্ত হাকীমগণের হাকীম সেই মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন আমাকে অসুখ দিয়েছেন। কাজেই আমার এই অসুখ সারা দুরূহ ব্যাপার। আমার হায়াত মুবারক শেষ হয়ে গিয়েছে। আমি থাকতে পারব না এখানে। তথাপিও মুরীদদের আশা উনারা বললেনহুযূর! আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমরা চিকিৎসা করি। তিনি চিন্তা করলেন সত্যিই চিকিৎসা করাতো সুন্নতঅসুবিধা নেই ঠিক আছে নিয়ে যাও আমার প্রস্রাব। নিয়ে যাওয়া হলো গাউসুল আযম শায়েখ সাইয়্যিদ মুহীউদ্দিন হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রস্রাব মুবারক একটি পাত্র করে এক বিধর্মী ডাক্তারের কাছে। ইসলাম সম্বন্ধে সেই ডাক্তারের তেমন জানাশোনা নেইহয়তো সামান্য কিছু জানে। যখন গাউসুল আযম শায়েখ সাইয়্যিদ মুহীউদ্দিন হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রস্রাব মুবারক সেই বিধর্মী ডাক্তারের কাছে পেশ করা হলোডাক্তার আশ্চার্য হয়ে মনে মনে চিন্তা করতে লাগল। সে প্রথমে বুঝতেই পারল না এটা প্রস্রাব। ডাক্তার জিজ্ঞেস করল। আপনারা এটা কি নিয়ে এসেছেনএত আতর গোলাপের ঘ্রাণ বের হচ্ছে এবং মনে হচ্ছে তার থেকে মহান আল্লাহ পাক উনার যিকির হচ্ছে। তখন গাউসুল আযম শায়েখ সাইয়্যিদ মুহীউদ্দিন হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুরীদ মুতাক্বিদগণ বললেনডাক্তার সাহেব মূলতঃ এটা হযরত গাউসুল আযম শায়েখ সাইয়্যিদ মুহীউদ্দিন হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার প্রস্রাব মুবারক   শুনে   ডাক্তার  সাহেব  আশ্চর্য  হয়ে  বললচিকিৎসা পরে হবে। তার আগে আমাদেরকে তওবা করান। প্রথমে মুসলমান করান। সেই মহল্লায় ছিল চারশত বিধর্মী লোক। তারা তওবা করে মুসলমান হয়ে গেল। সুবহানাল্লাহ!

ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, হাকিমুল হাদীছ, ইমামুল আইম্মাহ, মুহ্ইস সুন্নাহ ইমামে আ’যম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-২৫


সমঝ ও বিচক্ষণতা-২

পূর্ব প্রকাশিতের পর
অবশেষে ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট গিয়ে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বলল। হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি সবকিছু শুনে বললেন, তোমরা মহল্লার মসিজদের ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং দু চার জন গন্যমান্য ব্যক্তিকে আমার নিকট নিয়ে আস। তাদেরকে আনা হলে হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, “তোমরা কি চাওনা যে, এই ব্যক্তির চুরি হয়ে যাওয়া মালামাল সে আবার ফিরে পাক?” তারা বলল অবশ্যই চাই। ইমামে আ’যম রহমতুল্লাইহি আলাইহি বললেন, তাহলে তোমরা ফিরে গিয়ে তোমাদের এলাকায় যত চোর-বদমায়েশ আর সন্দেহজনক ব্যক্তি আছে সকলকে কোন একটা ঘরে বা মসজিদে জমা করো। এরপরে দু একজন দরজায় দাঁড়িয়ে যাও এবং যার মাল চুরি গেছে তাকেও সাথে দাঁড় করাও। অতঃপর একেকজন করে ঘর থেকে বের কর এবং এই লোককে জিজ্ঞেস কর, সে চোর কিনা। যদি চোর না হয় তাহলে বলবে, না এ লোক চোর না। আর যদি চোর হয় তাহলে চুপ থাকবে, কিছুই বলবেনা। আর তোমরা তাকে গ্রেফতার করে তদন্ত করবে। সেই ব্যক্তিই চোর হবে। হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পরামর্শ মত এভাবেই তারা চোর ধরে সব মালামাল উদ্ধার করল অথচ গৃহস্বামীর আহলিয়ার উপর তালাকও পড়ল না। সুবহানাল্লাহ!
ইবনে জাওযী, ইয়াহইয়া ইবনে জাফর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, এই ঘটনা আমি নিজ কানে হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট শুনেছি। হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, একবার আমি মরুভূমির মধ্যে সফর করছিলাম। রাস্তায় পিপাসা অনুভূত হল এবং পানির ভীষণ প্রয়োজন দেখা দিল। কিন্তু আশে পাশে কোথাও পানি ছিল না। এমন সময় গ্রাম্য এক লোক এক মশক পানি নিয়ে আমার নিকটে এল। আমি তার কাছে পানি চাইলে সে দিতে অস্বীকৃতি জানাল এবং বলল পাঁচ দিরহামের বিনিময়ে দিতে পারি। সুতরাং আমি পাঁচ দিরহাম দিয়ে মশকসহ তার কাছ থেকে পানি কিনে নিলাম। এরপরে আমি সেই বেদুইনকে বললাম জনাব! ছাতুর প্রতি যদি আপনার কোন আগ্রহ থাকে তাহলে আপনাকে দিতে পারি। সে বলল, দিন। আমি ছাতু দিলাম যা যাইতুনের তেলে মাখানো ছিল। সে খুব মজা করে পেট ভরে খেল। খাওয়ার পরেই তার পিপাসা লাগল ভীষন। একেতো ছাতু তার উপরে আবার তেল মাখানো। সে বড় অনুনয়- বিনয় করে আমার কাছে পানি চাইল। আমি বললাম জনাব, পাঁচ দিরহাম হলে এক পেয়ালা দিতে পারি। তার কমে হবে না। সে যেহেতু পানির মুখাপেক্ষি ছিল তাই এই প্রস্তাবেই রাজি হয়ে গেল। আমি এক পেয়ালা পানির বদলে আমার পাঁচ দিরহামও ফেরত পেলাম আবার মশক আর পানিও আমার কাছে রয়ে গেল।
একবার হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সামনে এক জটিল মাসয়ালা পেশ করা হলো। সমসাময়িক সকল হযরত ইমাম-মুজতাহিদীন উনারা সমাধান দিতে অপারগ হয়ে গিয়েছিলেন। পরে উনাকে জিজ্ঞাসা করা হল, “এক মহিলা ছাদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মই বেয়ে উপরে উঠছিল, হঠাৎ করে তার স্বামী তাকে দেখে ফেললো। স্ত্রীর এই কাজ তার খুব অপছন্দ হল তাই সে রাগান্বিত হয়ে বলল, যদি তুমি উপরে উঠ তাহলে তিন তালাক, আবার নিচে নামলেও তিন তালাক। এমতাবস্থায় তালাক থেকে বাঁচার জন্য মহিলা কি পন্থা অবলম্বন করবে? হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, একদম সহজ সমাধান রয়েছে। সেটা হল, মহিলা আর উপরে উঠবেনা এবং নিচেও নামবেনা। যেখানে আছে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে। আর কিছু লোক যেয়ে মইসহ তাকে নামিয়ে এনে মাটিতে রেখে দিবে তাহলে তালাক পড়বে না। আর তার স্বামীর কসমও ভঙ্গ হবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, এর অন্য কোন সমাধান আছে কিনা? তিনি বললেন, দ্বিতীয় আরেকটা সমাধান আছে সেটা হল কিছু মেয়ে লোক গিয়ে ঐ মহিলাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে তুলে নিয়ে এসে মাটিতে রেখে দিবে। তাহলে তালাক পড়বে না।
একবার লুলুই গোত্রের একটি দল কোন কাজ উপলক্ষে কুফায় আগমন করল। তাদের মধ্যে এক ব্যক্তির আহলিয়া ছিল খুবছূরত। কুফার জনৈক ব্যক্তির দৃষ্টি পড়ল তার উপর। সে কলা কৌশলে তার সাথে ভাব জমিয়ে তাকে নিজের স্ত্রী বলে দাবী করল। মহিলাও নিজের স্বামীকে অস্বীকার করে উক্ত কুফীকে স্বামী বলে পরিচয় দিল। তার আসল স্বামী লুলুই বেচারা পেরেশান হয়ে পড়ল। সে বলছে আমার স্ত্রী আর কুফী বলছে তার স্ত্রী। কিন্তু তার সাথে কোন সাক্ষি না থাকায় কেউ তার কথায় কান দিল না। অবশেষে হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট উক্ত ঘটনা ব্যক্ত করা হলো। তিনি কাজী ইবনে আবী লায়লাসহ আরো কয়েকজন কাজী, ফুকাহা আর মহিলাদের একটি দল নিয়ে উক্ত স্থানে পৌঁছলেন, যেখানে লুলুই গোত্রের লোকেরা তাঁবু ফেলে অবস্থান করছিল। সেখানে পৌঁছে তিনি আগন্তুক মহিলাদেরকে একে একে ঐ তাঁবুতে প্রবেশ করতে বললেন, যেখানে লুলুই ব্যক্তি অবস্থান করছিল। আদেশ অনুযায়ী কুফী মহিলারা যখন ঐ তাঁবুতে প্রবেশ করতে গেল তখন লুলুই ব্যক্তির কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করল এবং পথ রোধ করে দাঁড়াল। এর পরে হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উক্ত বিতর্কিত মহিলাকে লুলুই ব্যক্তির তাঁবুতে ঢুকতে বললেন। মহিলা তাঁবুর নিকট যাওয়ার সাথে সাথে কুকুরটি লেজ নাড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে লাগল এবং একবারও ঘেউ ঘেউ করল না। হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এই মহিলা প্রকৃত পক্ষে এই লুলুই ব্যক্তির আহলিয়া। কুকুরটি আগে থেকে তাকে চেনে বিধায় ঘেউ ঘেউ করে নাই। এরপরে মহিলার উপর চাপ প্রয়োগ করলে সেও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলল ইনিই আমার আসল স্বামী। শয়তানের ধোকায় পড়ে আমি মিথ্যা বলেছিলাম।


ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, হাকিমুল হাদীছ, ইমামুল আইম্মাহ, মুহ্ইস সুন্নাহ ইমামে আ’যম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-২৯


সমঝ ও বিচক্ষণতা (৬)
 * একদিন অনেক লোক একত্রিত হয়ে ইমামুল মুসলিমীন, ইমামুল মুহাদ্দিসীন ওয়াল ফুক্বাহা সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খিদমত মুবারকে হাজির হলো। জিজ্ঞাসা করলো, জামায়াতের সাথে নামায আদায়কালে ইমাম সাহেবের সাথে মুক্তাদিকেও সূরা ফাতিহা শরীফ পাঠ করতে হবে কিনা? সাইয়্যিদুনা ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তাদেরকে বললেন, তোমাদের এতো লোকের সাথে আমি একাকী কথা বলবো কিভাবে? বরং তোমরা একজনকে আমার সাথে কথা বলার জন্য মনোনীত করো। তার সাথে আমার কথোপকথনকেই পুরো জামায়াতের সাথে কথোপকথন বলেই তোমরা স্বীকার করে নাও।
এই প্রস্তাব অনুসারে তারা তাদের একজনকে ইমাম বা নেতা নির্ধারণ করলো। সাইয়্যিদুনা ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তখন তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, এই তো সব প্রশ্নের ফায়সালা হয়ে গেল। তোমরা যেভাবে একজনকে তোমাদের মুখপাত্র ঠিক করলে, সেভাবে জামায়াতের সাথে নামায আদায় করার সময় ইমাম সাহেব সকল মুক্তাদীর মুখপাত্র হয়ে থাকেন। কাজেই, ইমাম সাহেবের ক্বিরাআত পাঠ করাই সকল মুক্তাদির ক্বিরাআত পাঠের মধ্যে গন্য হয়ে থাকে।
আর পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইহাই বর্ণিত রয়েছে। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
من صلى خلف الامام فقرائة الامام قرائة له
অর্থ: “যে ব্যক্তি ইমাম সাহেবের পিছনে নামায আদায় করে তার জন্য ইমাম সাহেবের ক্বিরাআতই তার ক্বিরাআতের অন্তর্ভুক্ত।”
উল্লেখ্য যে, ইমামুল মুসলিমীন, ইমামুল মুহাদ্দিছীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অন্যতম অসাধারণ গুণ ছিল যে, তিনি অত্যন্ত জটিল ও কঠিনতম বিষয়কেও অল্প কথায় এবং সুন্দর দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝিয়ে দিতে পারতেন। যা সর্বসাধারণ সবাই সহজেই বুঝতে পারতো। কাজেই, অতি সহজেই তর্ক-বিতর্কও মিটে যেত।
ল হযরত মুহম্মদ ইবনে আব্দুর রহমান যিনি আবী লায়লা নামেই মাশহূর ছিলেন। তিনি ২৩ বছর কুফা শহরের কাজী ছিলেন। ইমামুল মুসলিমীন, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং উনার মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিল না। কারণ তিনি বিচারকার্যে ভুল করলে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনাকে শুধরিয়ে দিতেন। কাজী সাহেব পবিত্র মসজিদ মুবারকে বসে বিচার কার্য পরিচালনা করতেন।
একদিন তিনি বিচারকার্য শেষ করে রাস্তা দিয়ে চলছিলেন। পথে একজন স্ত্রীলোককে দেখলেন যে, সে অন্য একজন লোকের সাথে ঝগড়া করছে। স্ত্রী লোকটি উক্ত লোকটিকে “ইয়া ইবনে যানিয়াতাইন” অর্থাৎ ওহে দুই ব্যভিচারীর সন্তান বলে গালি দিল।
কাজী সাহেব হুকুম দিয়ে বললেন, স্ত্রী লোকটিকে গ্রেফতার করা হউক। তিনি পুনরায় বিচারের আসনে ফিরে আসলেন এবং হুকুম দিলেন স্ত্রী লোকটিকে দাঁড়ানো অবস্থায় দুটি দোররা মারা হউক।
ইমামুল মুসলিমীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইহা শুনে বললেন যে, কাজী সাহেব এই বিচারে কতগুলো ভুল করেছেন-
১। বিচার আসন থেকে উঠে গিয়ে পুনারায় ফিরে এসে এজলাস করেছেন। যা আদালতের নিয়মের খিলাফ।
২। পবিত্র মসজিদে শাস্তি দেয়ার হুকুম দিয়েছেন। অথচ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ করতে নিষেধ করেছেন।
৩। স্ত্রীলোককে বসিয়ে শাস্তি দেয়ার নিয়ম। কাজী সাহেব তারও খিলাফ করেছেন।
৪। একটি অপরাধজনক শব্দ উচ্চারণের শাস্তিও একটিই হবে। অথচ উনি দুটি দোররা মারার হুকুম জারী করেছেন।
৫। তাছাড়া দুটি দোররার প্রয়োজন হলেও তা এক সাথে মারা যাবে না। একটি মেরে অপরাধীকে ছেড়ে দিতে হবে। ঘা শুকানোর পর দ্বিতীয়বার মারতে হবে।
৬। সবচেয়ে বড় কথা হলো যাকে গালি দেয়া হয়েছে সে যখন বিচারের দাবী করলো না তখন কাজী সাহেবের বিচার করার ইখতিয়ার থাকলো না।
ইহা শুনে কাজী আবী লায়লা রহমতুল্লাহি আলাইহি অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। কুফার গভর্নরের নিকট অভিযোগ করলেন, “ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আমার কাজে বাধা সৃষ্টি করেছেন।” গভর্নর হুকুম জারি করলেন যে, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যেন আর কোন ফতওয়া না দেন।

October 21, 2018

Related image


মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক
النبى اولى بالـمؤمنين من انفسهم وازواجه امهاتهم
অর্থ: নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মু’মিনদের প্রাণ হতেও অধিকতর নিকবর্তী আছেন এবং উনার পবিত্র আযওয়াজুম মুত্বাহহারাত আলাইহিন্নাস সালামগণ উনারা হচ্ছেন মু’মিনগণের সম্মানিতা মাতা। (পবিত্র সূরাতুল আহযাব শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৬)
মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَن تُؤْذُوْا رَسُولَ اللّـهِ وَلَا ان تَنكِحُوا ازْوَاجَهُ مِن بَعْدِهِ ابَدًا ۚ إِنَّ ذلِكُمْ كَانَ عِندَ اللّـهِ عَظِيمًا
অর্থ: মহান আল্লাহ পাক উনার সম্মানিত রসূল উনাকে কষ্ট দেয়া এবং উনার সম্মানিত আযওয়াজুম মুত্বাহহারাত আলাইহিন্নাস সালামগণ উনাদেরকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য কখনোই বৈধ নয়। মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট এটা গুরুতর অপরাধ। (পবিত্র আহযাব শরীফ:পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৩)
উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় ওহাবী দেওবন্দীদের মুরুব্বী মুফতী শফী তার ‘মায়ারিফুল কুরআনে’ লিখেছে, “এরূপ বলাও অবান্তর নয় যে, রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র রওযা শরীফে পবিত্র হায়াত মুবারকে (জীবিত) রয়েছেন। উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ কোনো জীবিত স্বামীর আড়াল হয়ে যাওয়ার অনুরূপ। এজন্যই উনার ত্যাজ্য সম্পত্তি বণ্টন করা হয়নি এবং এর ভিত্তিতেই উনার আহলিয়াগণ উনারা অন্যান্য নারীদের মতো নন।”
হযরত কাজী ছানাউল্লাহ পানি পথি রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার তাফসীরে মাযহারী নামক কিতাবে লিখেছেন –
بل حياة الانبياء عليهم السلام اقوى منهم واشد ظهور اثارها فى الخارج حتى لا يجوز النكاح ازواج النبى صلى الله عليه وسلم بخلاف الشهداء.
অর্থ: বরং হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনাদের পবিত্র হায়াত মুবারক শহীদগণ উনাদের হায়াত মুবারক হতেও বহু বেশি শক্তিশালী এবং অত্যধিক তড়িৎ গতিতে প্রকাশিত হওয়াতে শ্রেষ্ঠতর। আর এ কারণেই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত আযওয়াজুম মুত্বাহহারাত আলাইহিন্নাস সালামগণ উনাদেরকে বিবাহ করা জায়িয নেই। পক্ষান্তরে শহীদগণ উনাদের আহলিয়াগণকে বিবাহ করা জায়িয রয়েছে। (তাফসীরে মাযহারী ১৫২, যিকরে জামীল ৪২পৃ:) এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ আছে-
لا عدة لانه صلى الله عليه وسلم حى فى قبره وكذالك سائر الانبياء.
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত আযওয়াজুম মুত্বাহহারাত আলাইহিন্নাস সালামগণ অর্থাৎ হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের উপর কোন ইদ্দত নেই। কেননা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ন্যায় অন্যান্য হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনারাও উনাদের রওজা মুবারকে যিন্দা আছেন। (শরহুশ শিফা ১ম খ- ১৫২ পৃষ্ঠা)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে –
قالت ام الـمؤمنين حضرت عائشة الصديقة عليها السلام كنت ادخل بيتى الذى فيه رسول الله صلى الله عليه وسلم وانى واضع ثوبى واقول انما هو زوجى وابى فلما دفن حضرت عمر الفاروق عليه السلام معهم فوالله ما دخلته الا وانا مشدودة على ثيابى حياء من حضرت عمر الفاروق عليه السلام
অর্থ : সাইয়্যিদাতুনা হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আমি আমার হুজরা শরীফে প্রবেশ করতে পর্দার প্রস্তুতি নিতাম না, যেহেতু সেখানে শুধু নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আমার পিতা হযরত ছিদ্দীক্বে আকবার আলাইহিস সালাম উনারা দুজন অবস্থানরত ছিলেন। আর উনারা আমার মাহরাম হওয়ায় পর্দার কোন প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু যখন সাইয়্যিদুনা হযরত উমর ফারূক আলাইহিস সালাম উনাকে আমার হুজরা শরীফে দাফন মুবারক করা হলো, তখন থেকে আমি উনাকে লজ্জা করতঃ খাছ শর’য়ী পর্দা ব্যতীত তথায় গমন করতাম না। কারণ সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি ছিলেন গাইরে মাহরাম। (মিশকাত শরীফ-১৫৪ পৃ.)
অত্র পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার আক্বীদা মুবারক ছিল এই যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি, সাইয়্যিদুনা হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম তিনি এবং সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনারা উনাদের পবিত্র রওযা শরীফে শুধু যিন্দাই নন বরং উনারা সবকিছু দেখেন। সুবহানাল্লাহ!
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে-
عن حضرت ابى الدرداء رضى الله تعالى عنه قال ان الله تعالى حرم على الارض ان تأكل اجساد الانبياء فنبى الله حى يرزق
অর্থ : হযরত আবু দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের জিসিম মুবারক যমীনের উপর ভক্ষণ করা হারাম করেছেন। সুতরাং মহান আল্লাহ পাক উনার হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা জীবিত ও রিযিকপ্রাপ্ত। (ইবনে মাজাহ শরীফ, মিশকাত শরীফ, জালাউল আফহাম ৬৩ পৃ:)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে –
قال حضرت فضل بن عباس رضى الله تعالى عنه اذا رأيت شفتيه يتحرك فادنيت اذنى عندها. فسمعت وهو يقول اللهم اغفر لامتى فاخبر تهم بهذا بشفقته على امته
অর্থ: হযরত ফযল বিন আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন- যখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন পবিত্র রওযা শরীফে তাশরীফ মুবারক নিলেন, তখন আমি শেষ বারের মত পবিত্র চেহারা মুবারক যিয়ারত করত: দেখতে পেলাম যে, উনার পবিত্র ঠোট মুবারক নড়ছে, তখন আমি আমার কর্ণ পবিত্র ঠোট মুবারকের নিকটস্থ করে শুনতে পেলাম যে, তিনি ইরশাদ মুবারক করছেন, ইয়া আল্লাহ পাক! আমার উম্মতদেরকে ক্ষমা করুন। আমি উম্মতের প্রতি দয়ালু। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শুভ সংবাদ উপস্থিত সবাইকে শুনিয়েছি। (মাদারিজুন্নাবুওয়াত ২য় খ-, ৪৪২ পৃ.)
এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পবিত্র রওযা শরীফ উনার মধ্যে রাখার পরও পবিত্র ঠোট মুবারকের কম্পন ছাবিত হলো। আর কম্পন মুবারক দেয়া “হায়াত” মুবারক ব্যতীত সম্ভব নয়।
وقال حضرت سعيد بن الـمسيب رضى الله تعالى عنه وما يأتى وقت صلوة الا سمعت الاذان من القبر الشريف.
অর্থ: হযরত সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়াব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আইয়ামে হাররার দিনগুলোর অবস্থা বর্ণনা করেন যে, এমন কোন নামাযের ওয়াক্ত অতিবাহিত হয়নি, যে ওয়াক্তে আমি পবিত্র রওযা মুবারক হতে আযানের ধ্বনি শুনিনি। (আলহাভী ২৬৬, যিকরে জামীল ৪৭ পৃ:)
وقال حضرت زبير بن بقاء رضى الله تعالى عنه فى اخبار الـمدينة لم ازل اسمع الاذان والاقامة من قبر رسول الله صلى الله عليه وسلم ايام حرة حتى عاد الناس.
অর্থ: হযরত যুবাইর ইবনে বাক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, আমি আইয়্যামে হাররার সময় পবিত্র মদীনা শরীফে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র রওযা মুবারক থেকে আযান ও ইক্বামতের ধ্বনি অনবরত শ্রবণ করতে থাকি যতক্ষণ না জনগণ প্রত্যাবর্তন করেছে। (মিশকাত শরীফ)
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আপনার নিকটবর্তী, দূরবর্তী এবং পরবর্তীতে আগন্তুকদের পবিত্র দুরূদ শরীফসমূহের অবস্থা কি হবে? তদুত্তরে তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
اسمع صلوة اهل محبتى واعرفهم
অর্থ: আমার সঙ্গে মুহব্বত ধারণকারীদের পবিত্র দূরূদ শরীফ আমি স্বংয় নিজে শুনি এবং আমি তাদের পরিচয় পাই। সুবহানাল্লাহ! (দালাইলুল খায়রাত, মাতালিউল মুসাররাত)
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন –
فِي رِوَايَةِ الْحَنَفِيِّ قَالَ: عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ” مَنْ صَلَّى عَلَيَّ عِنْدَ قَبْرِي سَمِعْتُه،
অর্থ : “যে ব্যক্তি আমার পবিত্র রওযা মুবারকের নিকটে এসে আমার প্রতি পবিত্র দুরূদ শরীফ পাঠ করবে আমি অবশ্যই উনার পবিত্র দরূদ শরীফ শুনতে পাই।” (বাইহাক্বী শরীফ, মিশকাত শরীফ/৮৭)
অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে –
اصحابى اخواتى صلوا على فى كل يوم الاثنين والجمعة فانى اسمع صلوتكم بلا واسطة.
অর্থ : “হে আমার ছাহাবীগণ, হে আমার উম্মতগণ! আপনারা আমার প্রতি প্রত্যেক ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ বা সোমবার ও ইয়াওমুল জুমুয়া বা শুক্রবার পবিত্র দরূদ শরীফ পাঠ করুন। নিশ্চয়ই আপনাদের সেই পবিত্র দরূদ শরীফ আমি বিনা মধ্যস্থতায় শুনতে পাই।” (মিশকাত শরীফ)
উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে –
سمعته سمعا حقيقيا بلا واسطة.
অর্থ: “(নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন), আমি হাক্বীক্বীভাবে বিনা মধ্যস্থতায় তা শুনতে পাই।” (মিরকাত শরীফ ২য় খন্ড, ৩৪৭ পৃষ্ঠা)
কিতাবে আরো উল্লেখ করা হয়েছে –
ان النبى صلى الله عليه وسلم فى قبره حى
অর্থ : “নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি রওযা মুবারকে জীবিত অবস্থায়ই আছেন।” (মিরকাত শরীফ ২য় খন্ড ২২৩ পৃষ্ঠা)
উপরোক্ত বর্ণনায় এটাই প্রমাণিত হলো যে, আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র রওযা মুবারকে স্বীয় উম্মতের দরূদ ও সালাম শুনতে পান। যদি তিনি হায়াতুন্ নবী না-ই হন তবে কি করে তা শুনতে পান? অবশ্যই তিনি হায়াতুন্ নবী।
قال حضرت ابراهيم بن شيبان رضى الله تعالى عنه حججت فجئت المدينة فتقدمت الى القبر الشريف فسلمت على رسول الله صلى الله عليه وسلم فسمعت. من داخل الحجرة يقول وعليك السلام.
অর্থ: হযরত ইবরাহীম বিন শায়বান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, আমি পবিত্র হজ্জ শেষে পবিত্র মদীনা মুনাওয়ারায় হাজির হলাম। তারপর পবিত্র রওযা মুবারকের নিকটস্থ হয়ে সালাম শরীফ পেশ করলাম। তখন পবিত্র রওযা শরীফ উনার ভিতর থেকে “ওয়া আলাইকাস সালাম উনার ধ্বনি শ্রবণ করলাম। (আল কাউলুল বাদী’)
ليس من عبد يصلى على الابلغنى صوته حيث كان قلنا وبعد وفاتك قال وبعد وفاتى ان الله عزوجل حرم على الارض ان تأكل اجساد الانبياء.
অর্থ: নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি আমার উপর দুনিয়ার যে কোন স্থান থেকে পবিত্র দূরূদ শরীফ পাঠ করুক আমি তার দুরূদ শরীফের আওয়াজ শুনতে পাই। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা আরয করলেন আপনার বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পরেও কি শুনতে পাবেন? তদুত্তরে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ ফরমান, হ্যাঁ পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পরও। কারণ একথা নিশ্চিত যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি যমীনের উপর হযরত নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের পবিত্র শরীর মুবারক ভক্ষণ করা হারাম করেছেন। সুবহানাল্লাহ! (জালাউল আফহাম, হুজ্জাতুল্লাহিল আলামীন)
এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবারে দূরূদ শরীফ পৌঁছে থাকে বলে ছাবিত হলো। এতে দূরবর্তী এবং নিকটবর্তীর কোন বাধ্যবাধকতা নেই এবং কাউকে পরিচয় করার শর্তও নেই। বরং স্বয়ং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শ্রবণ করা প্রমাণিত হয়েছে যাতে হায়াতুন নবী উনার সঙ্গে সঙ্গে উনার চরম উচ্চমানের শ্রবণ শক্তির সুস্পষ্ট দলীল রয়েছে।
সুলত্বানুল আরিফীন, মুজাদ্দিদে যামান আল্লামা হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি লিখেন-
قالت ام الـمؤمنين حضرت عائشة الصديقة عليها السلام لما مرض ابى اوصى ان يوتى به قبر النبى صلى الله عليه وسلم ويستأذن له ويقال هذا ابو بكر الصديق عليه السلام يدفن عندك يا رسول الله صلى الله عليه وسلم فان اذن لكم فادفنون وان لم يؤذن لكم فاذهبوا بى الى البقيع فاتى به الى الباب فقيل هذا ابو بكر الصديق عليه السلام قد اشتهى ان يدفن عند رسول الله صلى الله عليه وسلم وقد اوصانا فان اذن لنا دخلنا وان لم يؤذن لنا انصرفنا فنودينا ادخلوا وكرامة سمعنا كلاما ولم نر احدا.
وقال حضرت على كرمه الله وجهه عليه السلام فى رواية اخرى رأيت الباب قد فتح فسمعت قائلا يقول ادخلوا الحبيب الى حبيبه فان الحبيب الى الحبيب مشتاق.
অর্থ: উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, যখন আমার পিতা অসুস্থ হয়ে যান, তখন তিনি ওসিয়ত করলেন যে আমার বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পর আমাকে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র রওযা মুবারকের নিকটে নিয়ে গিয়ে অনুমতি প্রার্থনা করতঃ একথা বলবেন যে, “ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এই যে, হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকটে সমাধিস্থ হওয়ার ইচ্ছুক। আর তিনি আমাদেরকে অসিয়ত মুবারক করেছেন যে, যদি আপনি আমাদেরকে অনুমতি মুবারক দান করেন তবে আমরা প্রবেশ করবো। নতুবা আমরা ফিরে যাবো। এরূপ করার পর আমাদেরকে শুনানো হলো যে, আপনারা উনাকে প্রবেশ করিয়ে দিন অর্থাৎ দাফন মুবারক করুন। আমরা এ পবিত্র কালাম শরীফ শুনলাম কিন্তু কাউকে আর দেখলাম না। অন্য এক রিওয়ায়েতে হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, আমি দেখলাম দরজা মুবারক এমনিভাবেই খুলে গেছে। আর আমি একথা বলতে শুনলাম যে, বন্ধুকে বন্ধুর সঙ্গে মিলিয়ে দিন। একথা নিশ্চিত যে, বন্ধু বন্ধুর সঙ্গে মিলনের আশিক্ব হন। সুবহানাল্লাহ! (আল খাছাইছুল কুবরা ২য়, খ-, ২৮২ পৃষ্ঠা)
উপরোল্লিখিত রিওয়ায়েত দ্বারা হযরত ছিদ্দীক্বে আকবার আলাইহি ওয়া সালাম উনার বিশ্বাস স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হলো যে, তিনি অসিয়ত মুবারক করেছেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আালাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবার শরীফে গিয়ে আরয করার পর যে হুকুম মুবারক হবে তার উপর আমল করবেন।
روى حضرت ام المؤمنين عائشة الصديقة عليها السلام انها كانت تسمع صوت الوتد والمسمار يضرب فى بعض الدور المطنبة لمسجد رسول الله صلى الله عليه وسلم فترسل اليهم لا تؤذوا رسول الله صلى الله عليه وسلم.
অর্থ: উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। তিনি মসজিদে নববী শরীফ উনার সংলগ্ন ঘরসমূহ হতে পেরেকের শব্দ শুনলে মিস্ত্রীর নিকট পয়গাম পাঠিয়ে দিতেন যে, এরকম শব্দ করে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কষ্ট দিবেন না। (শিফাউস সিক্বাম- ১৫৫ পৃষ্ঠা)
অত্র পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার আক্বীদা মুবারক ছিল এই যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র রওযা শরীফে শুধু যিন্দাই নন বরং তিনি সবকিছুই দেখেন এবং অনুভব করেন যা উনার হায়াতুন নবী হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ। সুবহানাল্লাহ!

হায়াতুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদ
ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ক্বওল শরীফ

হযরত ইমাম যারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি লিখেন-
وقال الامام قسطلانى قد ثبت ان الانبياء يحجون ويلبسون فان قلت كيف يصلون ويحجون ويلبون وهم اموات فى الدار وليست دار عمل فالجواب انهم كالشهداء بل افصل منهم والشهداء احياء عند ربهم يرزقون فلايبعد ان يحجوا ويصلوا
অর্থ: ইমাম কুসতলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, নিশ্চয়ই একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রত্যেক হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা উনাদের মাযার শরীফে পবিত্র হজ্জ করেন, পবিত্র তালবিয়া পড়েন। যদি প্রশ্ন করা হয় যে, উনারাতো পবিত্র বিছাল শরীফ প্রাপ্ত এবং পবিত্র মাযার শরীফে অবস্থানরত উনারা কিরূপে পবিত্র নামায, পবিত্র হজ্জ এবং পবিত্র তালবিয়া শরীফ পাঠ করেন? তার জাওয়াব এই যে, উনাদের অবস্থা শহীদগণের ন্যায় বরং উনাদের চেয়েও অনেক উত্তম। আর শহীদ উনাদেরকে তো মহান আল্লাহ পাক তিনি রিযিক দান করেন। সুতরাং হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারা যদি পবিত্র হজ্জ করেন এবং পবিত্র নামায আদায় করেন তবে অযৌক্তিক হওয়ার কিছুই নয়। (যারকানী শরীফ ৩৩৩ পৃ:, যিকরে জমীল ৪৪ পৃ:)
বিখ্যাত ওলীআল্লাহ আল্লামা ছানাউল্লাহ পানীপথী রহমতুল্লাহি আলাাইহি তিনি বর্ণনা করেন-
ان الله تعالى يعطى لارواحهم قوة الاجساد فيذهبون من الارض والسماء والجنة حيث يشائون وينصرون اوليائهم ويدمرون اعدائهم ان شاء الله تعالى.
অর্থ: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত নবী রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনাদের পবিত্র রূহ মুবারক সমূহকে শারীরিক শক্তি মুবারক দান করেন, কাজেই উনারা যমীন, আসমান, বেহেশত যেখানে ইচ্ছে গমন করে স্বীয় বন্ধুগণকে সাহায্য এবং শত্রুদেরকে ধ্বংস করেন মহান আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছায়। (তাফসীরে মাযহারী)
বিখ্যাত মুহাদ্দিছ আল্লামা ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন –
ليس هنا موت ولافوت بل هو انتقال من حال الى حال وارتحال من دار الى دار وان المعتقد المحقق انه حى يرزق
অর্থ: এখানে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য মৃত্যুও নেই, নিঃশেষ হওয়াও নেই। বরং এক শান মুবারক হতে অন্য শান মুবারক উনার দিকে স্থানান্তরিত হওয়া এবং এক ঘর হতে অন্য ঘরে হিজরত করা। নিশ্চিত বিশ্বাস এই যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হায়াত মুবারকে (জীবিত) আছেন এবং সম্মানিত রিযিকপ্রাপ্ত হচ্ছেন। (শরহুশ শিফা শরীফ ১ম খ-, পৃ. ১৫২, মিরকাত শরীফ)
قال الامام الزرقانى رحمة الله عليه لانه صلى الله عليه وسلم حى فى قبره يعلم لمن يزوره ويرد سلامه.
অর্থ: ইমাম যারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বীয় রওযা মুবারকে হায়াত মুবারকে (জীবিত) আছেন, যিয়ারতকারীকে জানেন এবং পরিচয় পান। আর সালামের জাওয়াব দেন। (যারকানী শরীফ)
قال العلامة ابن حجر مكى رحمة الله عليه انه صلى الله عليه وسلم حى فى قبره يعلم بزائره
অর্থ: আল্লামা ইবনে হাজার মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, একথা নিশ্চিত যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বীয় পবিত্র রওযা শরীফ-এ হায়াত মুবারকে (জীবিত) আছেন, যিয়ারতকারীকে জানেন। (আল জাওহারুল মুনাজ্জম পৃ. ৪৬)
ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন –
ان الانبياء غيبوا عنا بحيث لا تدركهم وان كانوا موجودين احياء وذالكى كالحال فى الملائكة فانهم موجودون احياء ولا يراهم احد من نوعنا الامن خصه الى الله بكرامته.
অর্থ: হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারা আমাদের থেকে পর্দা করে যান আমরা উনাদেরকে দেখি না। যদিও উনারা যিন্দা আছেন। উনাদের অবস্থা ফিরিশতা সদৃশ হয়ে যায়। অর্থাৎ হযরত ফিরিশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা যিন্দা আছেন কিন্তু উনাদেরকে কেউ দেখতে পায় না। তবে হাঁ শুধু ঐ ব্যক্তি দেখতে পান যাঁকে মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার বিশেষ মেহেরবানী দ্বারা খাছ করেছেন। সুবহানাল্লাহ! (আলহাভী লিলফাতাওয়া ২য় খ. ৪৫১)
হযরত শায়েখ শামছ শুবরী শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন –
كرامة الاولياء ثابتة وتصرفهم لا ينقطع بالـموت ويجوز التوسل بهم الى الله تعالى والاستعانة بالانبياء والمرسلين وبالعلماء الصالحين بعد موتهم لان معجزة الانبياء عليهم السلام وكرامة الاولياء عليهم الصلوة والسلام فلانهم احياء فى قبورهم يصلون ويحجون كما وردت به الاخبار.
অর্থ: ওলী আউলিয়া উনাদের কারামত সত্য। মৃত্যুতে উনারা নিঃশেষ হন না। উনাদের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে উসীলা নেয়া জায়িয রয়েছে। হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম, হযরত উলামায়ে কিরাম এবং বুযুর্গানের ইন্তিকালের পরও উনাদের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করা জায়িয আছে। কারণ, হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনাদের মু’জিযাত এবং হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের কারামত উনাদের ওফাত মুবারকের পরও খতম হয় না। যেহেতু হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারা উনাদের রওযা শরীফসমূহে জীবিত আছেন নামায এবং পবিত্র হজ্জ আদায় করছেন। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে। সুবহানাল্লাহ! (শাওয়াহিদুল হক্ব)
لـما توفى رسول الله صلى الله عليه وسلم اقبل حضرت ابو بكر الصديق عليه السلام حين بلغة الخبر فدخل على رسول الله صلى الله عليه وسلم فكشف عن وجهه ثم اكبد عليه فقبله ثم بكى وقال بابى انت وامى طبت حيا وميتا اذكرنا يا محمد صلى الله عليه وسلم عند ربك.
অর্থ: যখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করলেন, তখন হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম তিনি এ খবর শুনে এসে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হুজরা শরীফে প্রবেশ করে পবিত্র চেহারায়ে আনওয়ার হতে পর্দা সরিয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার প্রিয় হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে নতশিরে চুম্বন মুবারক দিলেন। তারপর কেঁদে কেঁদে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমার মাতা-পিতা আপনার তরে কুরবান হোন। আপনি আপনার দুনিয়াবী হায়াত মুবারকে এবং তারপরও আনন্দিত থাকেন। হে মহান আল্লহ পাক উনার রসূল! মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে আমাদের কথা স্মরণ করবেন। সুবহানাল্লাহ! (খাছায়িছুল কুবরা শরীফ)
আর এ কথা তখনই বলা যায়, যখন এ বিশ্বাস হয় যে- নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হায়াত মুবারকে (জীবিত) আছেন, শ্রবণও করছেন এবং উত্তরও প্রদান করছেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের সময় উনার এ আমল মুবারকও হায়াতুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হওয়ার অকাট্য দলীল।
وقال حضرت ابو بكر الصديق عليه السلام لا ينبغى رفع الصوت على النبى صلى الله عليه وسلم حيا ميتا
অর্থ: হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বাহ্যিক হায়াত মুবারক এবং উনার পরের বরযখী হায়াত মুবারক উনার মধ্যেও উচ্চঃস্বরে কথা বলা জায়িয নেই। (শিফাউস সিক্বাম ১৫৪পৃ:)
এর দ্বারা হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহাস সালাম উনার আক্বীদা বিশ্বাস হায়াতুন নবী উনার ব্যাপারে সুস্পষ্ট হয় যে, তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রওযায়ে আতহারের নিকটে উচ্চস্বরে কথা বলা পর্যন্ত নিষেধ করেছেন।
ليس من يوم الا تعرض على النبى صلى الله عليه وسلم اعمال امته غدوة وعشية فيعرفهم بسيماهم واعمالهم فذلك ليشهد عليهم.
অর্থ: প্রত্যেক সকাল বিকাল উম্মতের আমলসমূহ নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবারে পেশ করা হয়। তখন তিনি তাদের চেহারা এবং আমলসমূহও চিনেন। অতএব তিনি উনাদের উপর সাক্ষ্যদান করেন। (মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ ২য় খ- ৩৮৭পৃ:)
উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা একথা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হলো যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম হায়াতুন নবী উনার উপর বিশ্বাসী ছিলেন। কেননা আমল এবং চেহারাসমূহের পরিচিতি এবং আমল পেশ করা এ সমস্ত কিছুই হায়াতুন নবী উনার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
রঈসুল মুহাদ্দিছীন শায়েখ হযরত আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন –
وحیات حضرت انبیاء کرام عیلھم السلام متفق علیہ است ہیچ کسر اور خلافے نیست حیات جسمانی و دنیا حقیقی نہ حیات معنوی روحانی. انبیاء کرام علیہم السلام کبھی معزول نہیں ہو تے، اللہ تعالی جو مراتب درجات رسالت انہیں عطافرما ئے ہیں وہ ان سے کبھی نہیں چینتا، رسالت موت کے بعد بھی قائم وجاری رہتی ہے، ہم تو یہانتک کہی گے کہ انبیاء کرام کو موت ںہیں آتی زندہ جاوید اور باقی ہیں.
অর্থ: হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারা হায়াত মুবারকে (জীবিত) থাকার উপর সবাই একমত, এতে কারো দ্বিমত নেই। উনাদের এ হায়াতে জিসমানী পার্থিব এবং যথার্থ, আধ্যাত্মিক এবং গোপনীয় নয়। হযরত আম্বিয়ায়ে কিরাম আলাইহিমুস সালাম উনারা কখনও বরখাস্ত হন না। উনাদেরকে মহান আল্লাহ পাক তিনি পয়গাম্বরত্বের যে পদ-মর্যাদা হাদিয়া করেছেন তা তিনি কখনও ছিনিয়ে নেননা। পয়গাম্বরত্ব পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পরও স্থায়ীভাবে চালু থাকে। বরং আমরা তো এ পর্যন্ত বলব যে, হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনারদের মৃত্যু আসেনি বরং উনারা যিন্দা এবং চিরঞ্জীব। (তাকমীলুল ঈমান পৃ. ১১৬)
আল্লামা ডা. ইক্ববাল বলেন –
میرا عقیده یہ ہے کہ نبی اکرم صلی اللہ علیہ وسلم زندہ ہیں، اس زمانے کے لوگوں بھی انکی صحبت سے اسی طرح مستفیض ہو سکتے ہیں جس طرح صحابہ کرام ہوا کرتے تھے. لیکن اس زمانے میں تو اس قسم کے عقائد کا اظہار   بھی اکثر دماغوں   پرنا گوار ہو گا اس واسطے خاموش رہتا ہوں.
অর্থ: আমার আক্বীদা বিশ্বাস এই যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জীবিত আছেন। এ যামানার মানুষও উনার সাহচর্যে এরূপ উপকৃত হতে পারেন। যেরূপ হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা উপকৃত হতেন। কিন্তু এ যামানায় তো এ ধরনের বিশ্বাসসমূহের প্রকাশও অধিকাংশ মস্তিষ্কের কাছে অমনোরম বা বিস্বাদ হবে। তাই আমি নীরব থাকি। (ফতরাকে রসূল ৭০ পৃ:)
হায়াতুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্মন্ধে একটি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা

অলিকুল শিরোমণি হযরত শায়খ সাইয়্যিদ আহমদ কবীর রিফায়ী রহমতুল্লাহি তিনি যখন ৫৫৫ হিজরীতে পবিত্র বাইতুল্লাহ শরীফ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে তাশরীফ নিয়ে যান তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র রওযা শরীফ যিয়ারতের জন্যও তাশরীফ নেন। পবিত্র রওযা শরীফ উনার নিকটে পৌঁছে তিনি উচ্চেস্বরে বললেন, “আসসালামু আলাইকা ইয়া জাদ্দী।” সাথে সাথে পবিত্র রওযা শরীফ থেকে আওয়াজ মুবারক আসলো- “ওয়া আলাইকুমুস সালাম ইয়া ওলাদী।” এ মুবারক আওয়াজ শুনে উনার উপর তন্দ্রাভাব এসে গেল। তিনি ব্যতীত যত লোক সেখানে উপস্থিত ছিলেন সবাই এ পবিত্র আওয়াজ মুবারক শুনতে পান। কিছুক্ষণ পর তিনি দু’টি কাছীদা শরীফ পাঠ করলেন যার অনুবাদ এই-
“বিচ্ছেদ এবং দূরত্বের অবস্থায় স্বীয় রূহকে দস্তবুছীর মর্যাদা লাভের জন্য পবিত্র রওযা মুবারকে প্রেরণ করতাম। বর্তমানে প্রকৃত প্রস্তাবে যখন আমার পবিত্র দীদার মুবারক নছীব হয়েছে। তাই দয়া বিতরণে আপনার পবিত্র দস্ত মুবারক দান করুন। তাহলে উহাতে চুম্বন করে সম্মানিত হবো।” সুবহানাল্লাহ!
তৎক্ষণাৎ রওযায়ে আত্বহার শরীফ থেকে পবিত্র হাত মুবারক নূর চমকিয়ে বের হলে তিনি উহাতে চুম্বন দিলেন তখন রওযায়ে আক্বদাস উনার পার্শ্বে প্রায় ৯০,০০০ নব্বই হাজার আশিক্বানে জামালে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র নূরানী হাত মুবারক উনার পবিত্র যিয়ারত মুবারক দ্বারা মর্যাদাবান হলেন তন্মেধ্যে গাউছুল আ’যম বড়পীর হযরত শায়েখ আব্দুল ক্বাদির জিলানী রহমুতল্লাহি আলাইহি তিনি, হযরত শায়েখ আদভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এবং হযরত শায়েখ আব্দুর রাজ্জাক হুসাইনী ওয়াসিতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের ন্যায় মহান বুযুর্গানে দ্বীন উনারা উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাকে এত প্রচুর পরিমাণ উলামায়ে কিরাম বর্ণনা করেছেন যে, তাতে ভুল ভ্রান্তি হওয়ার কোন অবকাশ নেই। (বুরহানুল মুয়াইয়্যাদের অনুবাদ বুনইয়ানুল মুশাইয়্যাদ ৩৫পৃ, আরকানে ইসলাম ৩২৬ পৃ:)
উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা চাক্ষুষভাবে হায়াতুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রমাণিত হলো। কারণ পবিত্র রওযা শরীফ হতে উচ্চস্বরে সালাম উনার জবাব দেয়া এবং পবিত্র হাত মুবারক বের করে দেয়া পবিত্র হায়াত মুবারকে থাকার পূর্ণ নিদর্শন, পবিত্র হায়াত মুবারকে না হলে সালামের জবাব দেয়া এবং পবিত্র হাত মুবারক বের করা সম্ভব নয়।
হায়াতুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে দেওবন্দীদের বক্তব্য
দেওবন্দী মৌলবী “আনওয়ার শাহ কাশমীরীর” বক্তব্য-
الانبياء فى قبورهم يصلون معناه ارواح الانبياء عليهم السلام ليست بمعطلة عن العبادات الطيبة والافعال الـمباركة بل هم مشغولون فى قبورهم ايضا كما كانوا مشغولين حين حياتهم فى صلوة وحج وكذلك حال تابعهم على قدر الـمراتب.
অর্থ : “হযরত আম্বিয়া আলাইহিস সালাম উনারা উনাদের মাযার শরীফসমূহে পবিত্র নামায পড়েন।” এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার অর্থ এই যে, হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনাদের পবিত্র রূহসমূহ ইবাদত বন্দেগী এবং বরকতময় কাজসমূহ হতে কর্মহীন বা অকেজো হন না। বরং উনারা উনাদের মাযার শরীফে এরূপ ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত থাকেন যেরূপ উনাদের যিন্দেগীর মধ্যে নামায রোযা হজ্জ ইত্যাদি নেক আমলে লিপ্ত ছিলেন। এরূপ উনাদের অনুসরনীয়দের অবস্থা উনাদের মর্যদানুযায়ী হবে। (ফয়দুল বারী ২য় খ-, ৬৪ পৃ:)
দেওবন্দী মৌলবী খলীল আহমদ আম্বেটীর বক্তব্য –
عندنا وعند مشائخنا حضرت الرسالة صلى الله عليه وسلم حى فى قبره الشريف وحياته صلى الله عليه وسلم دنيوية من غير تكليف وهى مختصة به صلى الله عليه وسلم وبجميع الانبياء صلوة الله عليهم اجمعين.
অর্থ: আমাদের এবং আমাদের পূর্বতন পীর মাশাইখগণের মতে – নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বীয় পবিত্র রওযা শরীফ উনার মধ্যে জীবিত আছেন এবং তিনি তথায় দুনিয়াবী হায়াত মুবারকের ন্যায়ই বর্তমান আছেন কষ্ট দেয়া ব্যতিরেকে। এ পবিত্র হায়াত মুবারক নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং অন্যান্য সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিস সালাম উনাদের বৈশিষ্ট্য। (আলমুহান্নাদ ১৩ পৃ.)
দেওবন্দী মৌলবী এযায আলীর বক্তব্য –
فمثله صلى الله عليه وسلم بعد وفاته كمثله شمع فى حجرة اغلق بابها فهو مستور عمن هو خارج الحجورة ولكن نوره كما كان بل ازيد ولهذه حرم نكاح ازواجه بعده صلى الله عليه وسلم ولم يجر احكام الميراث فيما تركه لانهما من الموت.
অর্থ: নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পর্দা করার দৃষ্টান্ত এরূপ যেমন একটি প্রদীপকে কোন কামরায় রেখে তার দরজা যদি বন্ধ করে দেয়া যায়। তবে এ প্রদীপটি ঐ বাতি হতে লুক্কায়িত থাকবে যে কামরার বাইরে আছে। কিন্তু বাতির আলো এরূপই হবে যেরূপ পূর্বে ছিল। বরং পূর্বের চেয়েও বেশি হবে। এজন্যই উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পর উনার সম্মানিতা পবিত্রা আহলিয়া হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সাথে বিবাহ করা হারাম এবং উনার ত্যাজ্য বিত্তের উপর ওয়ারিছী সত্ত্বের আইনসমূহ জারি হয়নি। কারণ উভয়টিই মৃত্যুর হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। (নুরুল ইজাহ ২০৫ পৃ:)
দেওবন্দী মুরুব্বী ক্বাসিম নানুতুবীর বক্তব্য-
“হায়াতুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি চিরস্থায়ী। এটা সম্ভবই নয় যে, উনার পবিত্র হায়াত মুবারক ক্ষীয়মান হয়ে যাবে। এবং হায়াতে মুমিন আকস্মিক, যা ক্ষীয়মান হতে পারে। সাধারণ মুমিনের ন্যায় মৃত্যু উনার হায়াতে তায়্যিবাকে খতম করে না। বরং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক উনার হায়াত মুবারককে ঢেকে রাখে। এ জন্য উনার হায়াত বাহ্যিক চর্ম চক্ষুবিশিষ্ট লোকের দৃষ্টি গোচর হতে গুপ্ত হয়ে যায়। শুধু অন্তর্চক্ষু বিশিষ্ট লোকেরা উনার হায়াত মুবারকের পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। যাদের জন্য মহান আল্লাহ পাক পর্দা তুলে রেখেছেন, সে অন্য এক স্থানে এ ধারণাকে এরূপভাবে ব্যাখ্যা করে; কিন্তু আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনার যিন্দেগী বাহ্যিক দৃষ্টিমানদের দৃষ্টিগোচর হতে গোপনীয়। উম্মতের ন্যায় উনাদের মৃত্যু মৃয়মান বা ক্ষণস্থায়ী হয় না। (আবে হায়াত ১৫৯-১৬০ পৃ:)
উপরোক্ত দলীলভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনা দ্বারা সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবেই প্রমাণিত হলো যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অবশ্য অবশ্যই “হায়াতুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কাজেই, “হায়াতুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিষয়টি অস্বীকার করার অর্থ হলো- পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদেরকে অস্বীকার করা, যা কাট্টা কুফরী। অর্থাৎ যারা এটাকে অস্বীকার করবে তারা কাট্টা কাফির হবে। এটাই সম্মানিত শরীয়ত উনার ছহীহ এবং গ্রহণযোগ্য ফায়ছালা।